আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশের প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও তার নেতাদের বিচার কার্যসম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দলটির যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের এক বিশেষ সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়েছিল। অর্থাৎ, আওয়ামী লীগ যাতে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে কোনও ভাবেই অংশগ্রহণ করতে না পারে তার ব্যবস্থা করতে তৎপর ইউনূসের সরকার। এই মুহূর্তে একটি মামলায় শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে, আরও দুটি মামলায় তাঁর যথাক্রমে ২১ ও ৭ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে। অর্থাৎ হাসিনা দোষী সাব্যস্থ হয়েছেন। পাশাপাশি তাঁর দলের একাধিক নেতারও সাজা হয়েছে। ফলে ইউনূস সরকার সহজে আওয়ামী লীগের জন্য নির্বাচনের রাস্তা করে দেবে না, এটা বলাই বাহুল্য। কিন্তু যে ভাবে তাঁর এবং অন্তর্বর্তী সরকারের উপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে, তাতে কতদিন তিনি আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের রাজনীতির বাইরে রাথতে পারবেন সেটাই বড় প্রশ্ন।
সম্প্রতি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের আমন্ত্রণে দিল্লি গিয়েছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান। তার আগেই হাসিনার সাজা ঘোষণা হয়ে গিয়েছিল। ফলে মনে করা হচ্ছিল, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশে ফেরানোর ব্যাপারে ব্যাপক তদবির করবেন খলিলুর রহমান। কিন্তু উল্টোটাই হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ভারতই উল্টে বাংলাদেশকে একাধিক শর্ত চাপিয়ে দিয়েছে। যদিও খলিলুরের ভারত সফর নিয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছে ইউনূসের সরকার। অন্যদিকে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা দোহা উড়ে গিয়েছেন দিল্লির ধমক খাওয়ার পরই। সেখানে তিনি মার্কিন কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করে বিষয়টি সহজ করতে গিয়েছিলেন, কিন্তু সেখানেও তিনি চাপে পড়েছেন বলেই খবর। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করার জন্য প্রতিনিয়ত ইউনূস সরকারের উপর আন্তর্জাতিক চাপ বেড়ে চলেছে। সবমিলিয়ে সময়টা মোটেই ভালো যাচ্ছে না নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদের।
প্রথমে আসি জাতিসংঘের কথায়। ইউনূসের আমন্ত্রণে জাতিসংঘের মানবাধিকার সংক্রান্ত একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে এসেছিলেন ছাত্র আন্দোলনের সময় শেখ হাসিনার সরকারের মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত করতে। তাঁরা রিপোর্টে জুলাই আন্দোলনে ১,৪০০ জন নিহত হওয়ার তথ্য রয়েছে। যদিও এতজনের মৃত্যুর খতিয়ান ইউনূস সরকার এখনও দিয়ে উঠতে পারেনি। তবে জাতিসংঘের রিপোর্টে অপরাধী ব্যক্তি এবং রাজনৈতিক দলকে আলাদা করা হয়েছিল। অর্থাৎ কেবলমাত্র আওয়ামী লীগের নামে বিচার নয়, ওই সময় সংগঠিক যাবতীয় অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার গ্রহণযোগ্য। পাশাপাশি জাতিসংঘ বলেছিল, একটি রাজনৈতিক দলকে অপরাধী ঘোষণা করা মানে তার রাজনৈতিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক অস্তিত্বকে অস্বীকার করা, যা জাতিসংঘ সমর্থন করে না। কিন্তু আদতে দেখা গেল, মুহাম্মদ ইউনূস সরকার জাতিসংঘের আংশিক রিপোর্ট নিয়ে মাতামাতি করলো এবং আওয়ামী লীগ ও দলের নেতা-নেত্রীদের উপর রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত কয়েকশো মামলা দায়ের করে একতরফা বিচার শুরু করে দিল। এটা নিয়ে এখন জাতিসংঘও অসন্তোষ প্রকাশ করছে।
বাংলাদেশে একটা ধারণা ছিল, মুহাম্মদ ইউনূস শুধু বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান নন, তিনি একজন নোবেলজয়ী ব্যক্তিত্ব। তাই তিনি বিশ্বনেতাদের কাছ থেকে বিশেষ অগ্রাধিকার পাবেন। কিন্তু একতরফা বিচারের মাধ্যমে ব্রিটিশ সাংসদ টিউলিপ সিদ্দিকের সাজা ঘোষণার পর ব্রিটেন সরকারও এবার চটেছে মুহাম্মদ ইউনূসের উপর। এমনকি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও ইউনূসের প্রতি আগের সমর্থন থেকে দূরে সরে গেছেন। একাধিক ব্রিটিশ সাংসদ ও আইনজীবী আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এর আগে ফ্রান্স-সহ একাধিক দেশও মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি ক্ষুব্ধ ছিলেন। আওয়ামী লীগের নির্বাসন উঠিয়ে নিতে, আসন্ন নির্বাচনে শেখ হাসিনার দলকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া আর্জি জানিয়ে একের পর এক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ইউনূস সরকারের উপর চাপ বৃদ্ধি করছে। তাঁরা খোলা চিঠি দেওয়ার পাশাপাশি আরও চাপ বাড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, যদি ‘বিচারাধীন’ হওয়ার যুক্তিতে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখা হয়, পশ্চিমাদের কাছে এর গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে হবে। আর তা কার্যত দিতে পারবে না ইউনূসের সরকার। এদিকে জানা যাচ্ছে, ভারত এবার অন্তর্বর্তী সরকারের উপর নজিরবিহীন চাপ বৃদ্ধি করতে চলেছে। হাসিনাকে আন্তর্জাতিক মিডিয়ার সামনে মুখ খোলার সুযোগ করে দেওয়াই নয়, জানা যাচ্ছে কূটনৈতিক মহলেও হাসিনার যোগাযোগের সুযোগ করে দিচ্ছে নয়া দিল্লি। যা ইউনূসের জন্য খুব একটা সুখকর নয়। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলের মতে, যে কোনও সময় আওয়ামী লীগের নিবন্ধন ফিরিয়ে দিতে পারেন মুহাম্মদ ইউনূস। চাপ বড় বালাই।
গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর অন্তবর্তী সরকার ক্ষমতায় আসে। মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সরকার গঠন হয়।...
Read more












Discussion about this post