গত শুক্রবার দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্ট্স ক্লাবে ‘সেভ ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ’ নামে এক কর্মসূচিতে অডিও ভাষণ দিয়েছিলেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই ভাষণে তিনি কার্যত পাঁচ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তার অন্যতম হল মুহম্মদ ইউনুসের পদত্যাগ এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে সংঘটিত হিংসা, মবসৃষ্টি, সংখ্যালঘুদের ওপর লাগাতার হিংসার ঘটনাবলীতে রাষ্ট্রসংঘের তদন্ত। ওই বক্তৃতার শুরুতেই তিনি বলেছিলেন, “বাংলাদেশ আজ এক গভীর খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে রয়েছে”। প্রায় এক ঘণ্টার বক্তৃতায় হাসিনা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানকে কখনও ‘খুনি ফ্যাসিবাদী’, কখনও ‘সুদখোর’, কখনও ‘টাকা পাচারকারী’, আবার কখনও ‘ক্ষমতালোভী বিশ্বাসঘাতক’ বলেও আক্রমণ শানিয়েছিলেন। দিল্লিতে ওই অনুষ্ঠানে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বেশ কয়েক জন প্রাক্তন মন্ত্রী, সাংসদরাও। সেখানে দেওয়া দীর্ঘ বক্তৃতায় ইউনূসের সরকারকে ‘অবৈধ’ এবং ‘হিংসাত্মক’ বলেও দেগে দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। যা নিয়ে কার্যত তোলপাড় শুরু হয়েছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আঙ্গিনা। বাধ্য হয়েই মুখ খুলতে হল অন্তর্বর্তী সরকারকে। এক বিবৃতি জারি করে বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রক হাসিনার বক্তৃতা নিয়ে এবার দিল্লির দিকেই আঙুল তুলল।
রবিবার ঢাকায় বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের তরফে সরকারিভাবে জারি করা বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মানবতাবিরোধী অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত শেখ হাসিনাকে একটি জনসমাবেশে বক্তব্যের সুযোগ দেওয়া হয়। হাসিনার বক্তব্যে তিনি প্রকাশ্যেই বাংলাদেশের সরকার উৎখাতের আহ্বান জানান এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ভণ্ডুল করতে তাঁর দলীয় অনুগতদের ও সাধারণ জনগণকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতে স্পষ্ট উসকানি দেন। বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের দাবি, প্রকাশ্যে হাসিনার বক্তৃতা বাংলাদেশের নিরাপত্তা এবং গণতন্ত্রের জন্য ‘হুমকি’। ইউনুস সরকারের আরও দাবি, দিল্লির মদতে এই ঘটনা সম্ভব হচ্ছে। দীর্ঘ বিবৃতিতে ঢাকা জানিয়েছে, দ্বিপাক্ষিক বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে বারবার অনুরোধ জানানো হলেও ভারত এখনও সেই বিষয়ে কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। বরং নিজ ভূখণ্ড থেকে এ ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্যের সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, শান্তি ও নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে বলে মনে করছে ঢাকা।
মজার বিষয় হল, এই বিবৃতিতেও বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রণালয় সেই বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির বিষয়টি সামনে এনেছে। তাঁদের দাবি, দ্বিপাক্ষিক বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে বারবার অনুরোধ জানানো হলেও ভারত এখনও সেই বিষয়ে কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। বরং নিজ ভূখণ্ড থেকে এ ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্যের সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, শান্তি ও নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে বলে মনে করছে ঢাকা। কার্যত সরাসরি নরেন্দ্র মোদি সরকারকে কাঠগড়ায় তুলে ইউনূসের সরকারের বক্তব্য, ভারতের রাজধানীতে এ ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজনের সুযোগ এবং একজন দণ্ডিত ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে ‘বিদ্বেষমূলক বক্তব্যে’র অনুমতি দেওয়া রাষ্ট্রসমূহের পারস্পরিক সম্পর্কের মৌলিক নীতিমালার বিরুদ্ধে। সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণের পরিপন্থী। এতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে বলেও দাবি করেছে ঢাকা।
ভারতের প্রতি বাংলাদেশের ইউনূস সরকারের এই কড়া বিবৃতি নিয়ে কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এর পাল্টা বিবৃতি দিতে পারে নয়া দিল্লি। সেটা কি ধরণের হয়, সেটা দেখার জন্য মুখিয়ে রয়েছেন অনেকে। সূত্রের খবর, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনস্থাপন করার প্রচেষ্টায় রয়েছে ভারত। প্রথমে তারেক রহমানকে বাংলাদেশে প্রবেশে সুযোগ করে দেওয়া সেই প্রচেষ্টারই অঙ্গ। এর পরের পালা হাসিনা এবং তাঁর পরিবারের। বাংলাদেশ থেকে অপসারণের পর প্রথম ছয় মাস একেবারেই মুখ খোলেননি শেখ হাসিনা। তারপর ধীরে ধীরে সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি সরব হতে শুরু করেন। আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড ফেসবুক, ইউটিউব-সহ অন্যান্য প্ল্যাটফর্মগুলিতে হাসিনা পরস্পর বক্তব্য রাখতে শুরু করেন। তাতেই কার্যত হিলে যায় মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার সহযোগীরা। হাসিনার মুখ বন্ধ করার জন্য নয়া দিল্লি বরাবর একের পর এক চিঠি দেয় ঢাকা। কিন্তু ভারত সেই চিঠির জবাব তো দেয়নি, উল্টে কোনও ব্যবস্থাও নেয়নি। এরপর সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেওয়া শুরু করেন শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব। তাতেও চাপে পড়েন ইউনূস সাহেব। এবারও ভারতকে চিঠি দেয় তাঁর অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা, ভারত কোনও তাপ উত্তাপ দেখায়নি ঢাকার চিঠি পেয়ে, এমনকি প্রাপ্তিস্বীকারও করেননি। এবার তো প্রকাশ্য সাংবাদিক সম্মেলনে হাসিনার বিস্ফোরক অডিও বার্তা শোনানো হল। যা নিয়ে তোলপাড় ঢাকা। বিবৃতি জারি করে নয়া দিল্লিকে কাঠগ়ড়ায় তোলা হল। কিন্তু নিশ্চুপ মোদি সরকার। এবার কি তাহলে আরও বড় প্রত্যাঘাতের অপেক্ষা?












Discussion about this post