শব্দ বা নাদ। হিন্দুশাস্ত্র অনুযায়ী, একে বলা হয়ে থাকে ব্রহ্ম। তাহলে তাঁর শক্তি কত হতে পারে, তার কোনও সঠিক ধারণা কারও মধ্যে নেই। তবে শব্দ যে সব কিছু ওলট পালট করে দিতে পারে, সব হিসেব উল্টে দিতে পারে, তা নিয়ে কারও মনে কোনও সন্দেহ নেই। অদূরভবিষ্যতেও কোনও সন্দেহ তৈরি হবে না। তদারকি সরকারের প্রাক্তন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের বিস্ফোরক বয়ান ঘিরে তোলপার পদ্মার অন্যপ্রান্ত। সেই বিষয়ে যাওয়ার আগে রাজসাক্ষী নিয়ে কিছু কথা।
রাজসাক্ষী কাকে বলে? যে, যিনি বা যাঁরা কোনও অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার পর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক বয়ান দিয়ে থাকেন, তাঁকে বা তাদের রাজসাক্ষী বলা হয়। অপরাধী থেকে রাজসাক্ষী হলে, তার সাজা অবধারিতভাবে হ্রাস পায়। কিন্তু আদালত সেই ব্যক্তির দেওয়া বয়ান খতিয়ে দেখা দরকার মনে করল তারা সেটা করতে পারে। খতিয়ে দেখলে যদি দেখা যায় আদালতে দেওয়া বয়ানের সঙ্গে অপরাধের কোনও মিল নেই বা বক্তব্য আদালতকে বিভ্রান্ত করার একটা কৌশল, সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির রাজসাক্ষী হওয়ার সুযোগ থাকে না। বাংলাদেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইনে বিচার ব্যবস্থায় রাজসাক্ষী হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এই ধারায় বলা হয়েছে, ম্যাজিস্ট্রেট অপরাধ তদন্ত, অনুসন্ধান বা বিচারের যে কোনও পর্যায়ে অপরাধটির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত বা সে সম্পর্কে তাঁর কাছে গোপন তথ্য রয়েছে, সে ক্ষেত্রে সেই গোপন তথ্য আদায়ের জন্য তাঁকে এই শর্তে ক্ষমা করে দিতে পারে। ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ১৫ নম্বর ধারা অনুসারে, এই ধরনের রাজসাক্ষী হিসেবে সহ অভিযুক্তকে পরীক্ষা করার বিধান রয়েছে।
এবার সংবাদ শিরোনাম নিয়ে আলোচনা। শিরোনামে যিনি অর্থাৎ আসিফ মাহমুদ, তদারকি সরকারের আমলে একজন উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি সম্প্রতি বিস্ফোরক বয়ান দিয়েছেন। সেই বয়ানে পরিষ্কার হয়ে যায় যে বাংলাদেশে ২০২৪-য়ের জুলাই-অগাস্টে হাসিনার পতন থেকে ইউনূস সরকার উত্থান – সব কিছুর নীল নকশা করেছিল আমেরিকা। বিষয়টা এখন কিন্তু আর আসিফের বয়ানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। দাবি উঠছে প্রয়োজন হলে তদারকি সরকারের এই উপদেষ্টাকে গ্রেফতার করে রাজসাক্ষী করা হোক। কারণ, তাকে জেরা করে আরও অনেক কিছু জানা যাবে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করতে আমেরিকা যে উঠে পড়ে লেগেছিল, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রশ্ন এখানে অন্যত্র।
তার আগে আসিফের বক্তব্য। সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার যেন ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে পারে– ‘ডিপ স্টেট’ এমন একটা স্ট্রাটেজি সাজিয়ে দিয়েছিল। আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ‘আমরা যখন সরকারের দায়িত্বে ছিলাম, শুরুর দিকে আমাদের বিভিন্ন শক্তিশালী ইনস্টিটিউশন, যাদেরকে আসলে ‘ডিপ স্টেট’ বলা হয়, তাদের কাছ থেকে আমাদের অফার করা হয়েছিল। বলা হয়েছিলো, ‘শেখ হাসিনার যে মেয়াদ আছে ২০২৯ সাল পর্যন্ত, সেটি আপনারা শেষ করুন। আমরা আপনাদের সহযোগিতা করব।’ তিনি জানান, প্রস্তাবের সঙ্গে কিছু শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়েছিল।
একা কি আসিফ মাহমুদ জড়িত? জড়িত আরও একজন। তিনি মুহাম্মদ ইউনূস। তাকে অবিলম্বে গ্রেফতার করার দাবি তুলেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ। তাদের মতে, এই ইউনূসের জন্য বাংলাদেশ আমেরিকার হয়ে দালালি করেছে। হাসিনার তৈরি করে দেওয়া একটি দেশের ধনসম্পদ লুঠ করেছে। নিজেরা হয়েছেন অর্বুদপতি। আর দেশের মানুষকে তারা ভিখারী করেছে। প্রধান উপদেষ্টা সহ তদারকি সরকারের সব উপদেষ্টার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশনে একাধিক মামলা হয়েছে। মামলা আরও হবে।
এই সব ঘটনার নিরিখে বাংলাদেশে এখন দাবি উঠেছে তারেক সরকার অবিলম্বে আসিফ নজরুলকে রাজসাক্ষী করুক। সেটা করলে তাঁর শাস্তি অনেকটাই লাঘভ হবে ঠিক। কিন্তু যে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরকারের হাতে আসবে, সেটা আসিফের বক্তব্যের থেকেও আরও বিস্ফোরক হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আরও একটা প্রশ্ন ঘোরাফেরা করছে। সেই প্রশ্ন হল – আসিফ মাহমুদ কি নিজের পিঠ বাঁচাতে চেয়ে এখন ওই সব চাঞ্চল্যকর তথ্য দিচ্ছেন। এই তথ্য তো তিনি সরকারে থাকার সময়ে দিতে পারতেন। তাহলে তিনি এখন দিচ্ছেন কেন? তবে কি তিনি কোনও প্রান্ত থেকে সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় ছিলেন।











Discussion about this post