সংবাদের শিরোনাম দেখে অনেকে বিস্মিত হতে পারেন। কারণ, আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি দুটি ভিন্ন মেরুর রাজনৈতিক দল। এই দুই দলের সম্পর্ক কেমন, তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশের মসনদে এখন বিএনপি। জামাতা এবং এনসিপিকে হারিয়ে তারা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। তারপরেও কেন বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ ছাড়া বিএনপি অসম্পূর্ণ? কেন, আওয়ামী লীগ তারেক রহমানের বাহিনী অক্সিজেন সিলিন্ডার ? আওয়ামী লীগ না ফিরলে কেন তাদের সমস্যা হতে পারে? শুধু সমস্যা নয়, আওয়ামী লীগ না ফিরলে বাঁচবে না বিএনপি। প্রশ্ন উঠতে পারে, বিএনপিকে মারবে কে? কীভাবে মারবে? অবধারিতভাবে উঠে আসে এই প্রবল আক্রমণ থেকে বাঁচার পথ হিসেবে তারেক রহমান এবং বিএনপির সামনে কী কী রাস্তা খোলা রয়েছে? সেই বাঁচার রাস্তায় কোনওভাবে কি আওয়ামী লীগের উপস্থিতির প্রয়োজন আছে?
বাংলাদেশ সংসদে প্রতিপক্ষ হিসেবে আছে দুটি মাত্র রাজনৈতিক দল। একটি বিএনপি সেন্টার রাইট। অর্থাৎ মৃদু ধর্মীয় রাজনীতি। অপরটি জামাতের ফার রাইট। অর্থাৎ উগ্র ধর্মীয় রাজনীতি। বিএনপিতে একেবারে নেই, তা নয়। তবে জামাতের থেকে তুলনামূলকভাবে কম। এর বাইরে রয়েছে পাকিস্তান ও ভারতের চাপ। বিএনপির কাছে জাতীয়তাবাদ, বাঙালি ঐক্য এবং ঐতিহ্যের একটা গুরুত্ব রয়েছে। আছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি সম্ভ্রমবোধ। আওয়ামী লীগের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে বিএনপির মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মধ্যে বিরোধ আছে। ৭১ –য়ের দাবিদার হতে পারে দুই পক্ষ। এটা নতুন বা বিচ্ছিন্ন সংকট নয়। এই ধরনের সংকট শুধুমাত্র যে বাংলাদেশে প্রতীয়মান তা নয়, পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও স্বাধীনতা নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের চেতনার মধ্যে দৃশ্যত একটা তফাৎ চোখে পড়ে। ভারতের কথাই ধরা যাক। স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতাজি ও গান্ধির মধ্যে কার অবদান সব থেকে বেশি – এই নিয়ে জাতীয়স্তরে আলোচনা পর্যন্ত হয়ে গিয়েছে। দেশ গঠনে নেহরুর অবদান বেশি না বল্লভভাইট প্যাটেলের অবদান বেশি, তা নিয়ে কম তর্ক হয়নি। আগামীদিনেও হতে পারে। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ মনে করে মুক্তিযুদ্ধে শেখ মুজিবুরের অবদান অনেক বেশি। তাদের কাছে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু। আবার বিএনপি মনে করে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা অনেকে বেশি। তাঁর অবদান কোনওভাবেই মুছে ফেলা যাবে না। ইতিহাস মনে রাখবে। বাংলাদেশে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ দাঁড়িয়ে আছে ঠিক এই জায়গায়। বিএনপির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আবার আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের মধ্যে একটা বড়ো পার্থক্য ধরা পড়ে। এই জন্য অবশ্য পুরো দায় বাংলাদেশের ঘাঁড়ে দেওয়া যায় না বলে মনে করে রাজনৈতিকমহলের একাংশ। ভারত নিজে আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে যতটা সহজ, বিএনপির ক্ষেত্রে ঠিক ততটা নয়। অটল বিহারী বাজপেয়ি আমলে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন ব্রজেশ মিশ্র। তিনি খালেদ জিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করার বহু চেষ্টা চালান। তাঁর ভারত সফরের ব্যবস্থা করেন। সেই সময় ঘটে চট্টগ্রাম অস্ত্র কেলেঙ্কারি। ঘটনায় ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক ভীষণভাবে তলানিতে গিয়ে ঠেকে। ফলে, ভারতের কাছে মিত্র হিসেবে সেই সময় আরও একবার রাজনীতির মঞ্চে আত্মপ্রকাশ ঘটে আওয়ামী লীগের। গত ১৫-১৬ বছরে ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যের নিরাপত্তা নিয়ে ছিটেফোটা চিন্তা করতে হয়নি। বিএনপি যদি এই উদ্বেগ বুঝে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে দিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক এক উচ্চমাত্রা পাবে। আর সখ্যতা হলে দুই দেশের মঙ্গল। মুক্তিযুদ্ধের আলোকে বিচার করলে দেখা যাবে দুই রাজনৈতিক দল কিন্তু এক মেরুবিন্দুতে স্থির। ভারতের বর্তমান মোদি সরকার দুই দলের প্রতি সমদৃষ্টি বজায় রেখেছেন। হাসিনা আমলে ভারত এবং বাংলাদেশ নানা বিষয়ে একে অপরকে সাহায্য করে এসেছে। শেখ হাসিনাকে রাজকীয় অতিথির মতো রাখা হয়েছে। আবার বিএনপি ক্ষমতার বাইরে থাকাকালীন ভারত নানাভাবে তাদের সাহায্য করেছে। বলা হচ্ছে বাংলাদেশে ক্ষমতার মসনদে বিএনপির আসীন হওয়ার পিছনে রাজনৈতিক মঞ্চের পর্দার পিছনে কাজ করেছে সাউথব্লক।











Discussion about this post