নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর প্রথম সাংবাদিক সম্মেলনে তারেক রহমানকে বিদেশের একটি গণমাধ্যমের সাংবাদিক প্রশ্ন করেন বহু আওয়ামী লীগার এখনও জেলে রয়েছেন। তাদের কীভাবে রিকনসিলিয়েশন হবে? তারেকের সংক্ষিপ্ত জবাব ছিল আইনের শাসন নিশ্চিত করার মধ্যে দিয়ে। ২৩ ফেব্রুয়ারি নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে একই প্রশ্ন করা হয়েছিল। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “নিরীহ মানুষ যাতে ভোগান্তির শিকার না হন সে দিকে সরকারের লক্ষ্য থাকবে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ওই দলের যে সব নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, সেই সব মামলা খতিয়ে দেখা হবে।” কার্যক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে তারা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কাজ হচ্ছে ঠিক তার উল্টো। ইউনূস সরকারের আমলে যেটি ছিল হত্যামামলা বাণিজ্য, সেটা বর্তমানে শোন অ্যারেস্ট বাণিজ্য হিসেবে দেখানো হচ্ছে। এখনও বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলে আটক রয়েছেন বহু আওয়ামী লীগার। তারা জামিনের জন্য আদালতে আবেদন করছেন। আদালত জামিন মঞ্জুর করছে। কিন্তু তারা জেল থেকে ছাড়া পাচ্ছেন না। পুলিশ ও স্থানীয় বিএনপি নেতাদের বাধায় তারা জেল থেকে ছাড়া পাচ্ছে না। ঠিক এই ছবি দেখা গিয়েছিল পূর্বতন তদারকি সরকারের আমলে।
বাংলাদেশের মানবাধিকারের নানা বিষয় নিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৬ –য়ে বলা হয়েছে, ক্ষমতাচ্যূত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কিম্বা প্রতিশ্রুতি মানবাধিকার সংস্কারে ব্যর্থ হয়েছে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। অথচ বাংলাদেশের আইনে বিচার ছাড়া কাউকে এক মুহূর্ত আটকে রাখা যায় না। কিন্তু আইন আছে আইনের জায়গায়। আর তদারকি সরকার ছিল তাঁর জায়গায়। যার শ্বাসকষ্টে মৃত্যু হয়েছে, তাতেক দেখানো হয়েছে গুলিতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। অবস্থা একটা পর্যায়ে এমন জায়গায় চলে গিয়েছিল যে তদারকি সরকার কার্যত তোলাবাজি শুরু করে। টাকা দিলে ছাড়, না দিলেই তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যে মামলা রুজু করে তাঁকে জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হত।
বাংলাদেশে জুলাই-অগাস্টের আন্দোলনে হত্যা ও হত্যার চেষ্টা সহ বিভিন্ন ঘটনায় প্রায় দেড় হাজার মামলা হয়েছিল। এই সব মামলায় গণআসামী করার নেপথ্যে চাঁদাবাজি বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া পূর্ব শত্রুতা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান দখলের নেপথ্য কারণ বলে অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশে পালাবদলের পর অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন যে সার্বিকভাবেই দেশের পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে। ক্ষমতায় আসীন দল বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন করবে না। আওয়ামী লীগকে চিরকালের জন্য জাতীয় রাজনীতি থেকে মুছে দিতে আগের সরকার নিয়েছিল ডেভিল হান্টের মতো পদক্ষেপ। অভিযান চলে দুই পর্যায়ে। আওয়ামী লীগের ২৮ হাজারে বেশি নেতাকর্মীকে সেই সময় গ্রেফতার করা হয়। নতুন সরকার আসার পর একটা আশা তৈরি হয়। বিরোধীদল বিশেষ করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বিশ্বাস করতে শুরু করে বিএনপি সরকার তাদের সঙ্গে প্রতিহিংসার রাজনীতি করবে না। প্রকৃত দোষীদের শাস্তি হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল উল্টো ছবি। সরকার গঠনের এক মাস যেতে না যেতেই আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টদের শোন অ্যারেস্ট বা গ্রেফতার দেখানো মামলার ওপর সরকারের অব্যাহত নির্ভরতা ইঙ্গিত দেয়। তারেক রহমানের কথাগুলো কেবল কথা হয়ে রয়ে গিয়েছে। বিএনপি সরকার আইনের শাসনে বিষয়ে খুব একটা গুরুত্ব দিয়ে দেখছে না। সরকারল যদি সত্যিই আইনের শাসনের ওপর ভিত্তি করে বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে প্রমাণ করতে হবে ফৌজদারি প্রক্রিয়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে না। কিন্তু পুলিশের এমন উদ্যোগের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীরবতা ঠিক উল্টো বার্তা দেয়। যদি ম্যাজিস্ট্রেটের প্রমাণ ছাড়া শোন অ্যারেস্টের আবেদনের অনুমোদন দিতে থাকেন, তাহলে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন হবে যে সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আটকে রাখতে ফৌজদারি প্রক্রিয়ার অপব্যবহার মেনে নিচ্ছে। উৎসাহ দিচ্ছে।












Discussion about this post