অনিলায়নের পর এবার তারেকায়ন। বিষয়টা কি, তা জানাতেই এই প্রতিবেদন।
বাংলায় তখন বামেদের রাজত্ব। দলের রাজ্য কমিটির সম্পাদক পদে তখন অনিল বিশ্বাস। স্কুল কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় – প্রধান শিক্ষক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে সেই সময় যাদের নিয়োগ করা হয়েছিল তারা সকলেই আলিমুদ্দিনের সুপারিশে নিয়োগ পেয়েছিলেন। বা আলিমুদ্দিন-ঘনিষ্ঠ। অভিযোগ তেমনই। এমনকী স্কুল বা কলেজ পরিচালন কমিটি পদেও লালে লাল। সেই সময় গাঁগঞ্জের স্কুল কলেজের ঘটনা তো সবাইকে অবাক করে দিয়েছিল। যিনি পঞ্চায়েত প্রধান তিনি আবার কোনও কোনও স্কুলের প্রধান শিক্ষক। একজন পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য আবার স্কুল পরিচালন কমিটিতে রয়েছে। জয় বাবা ফেলুনাথ ছবির মগন লালের সংলাপ ধার করে বলতে হয়, “লাল মোহন, মোহন লাল, মগন লাল – সোব লালে লাল।” বঙ্গ মিডিয়ায় একটি নতুন শব্দের জন্ম হল অনিলায়ন। বলা যেতে পারে, অনিলের অচলায়তন। এবার বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রশাসনিক স্তরে রদবদলের ফলে যারা নিয়োগ পেয়েছেন, তারা কোনও না কোনওভাবে বিএনপির সঙ্গে যুক্ত। অনিলায়নের সূত্র ধরে বলতে হয় বাংলাদেশে প্রশাসনিকস্তরে হয়েছে তারেকায়ন। তার কিছু নমুনা এখানে তুলে ধরা যেতে পারে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠনের আগে প্রশাসনের দুটি শীর্ষ পদের দুইজন সরে গিয়েছেন। একজন মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশিদ, অন্যজন প্রধান উপদেষ্টার মুখ্যসচিব এম সিরাজউদ্দিন মিয়া। তারপর থেকে সব জরুরী জায়গায় বিএনপি তাদের নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী নিয়োগ করতে শুরু করেছে। সেনাবহিনীর শীর্ষপদে ইতিমধ্যে বড় ধরনের রদবদল ঘটিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক। বাহিনী প্রিন্সিপ্যাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল কামরুল হাসানকে রাষ্ট্রদূত করে পররাষ্ট্র মন্ত্রকে বদলি করা হয়েছে। তাঁর জায়গায় এসেছেন মেজর জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমান। বাহিনী চিফ অব জেনারেল স্টাফ হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাইনুর রহমান। ২৩ ফেব্রুয়ারি আরও একদফা বাহিনীতে পরিবর্তন আনেন তারেক। বাহিনীর আরও দুই কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ১০ পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কম্যান্ডিং এবং কক্সবাজার এরিয়া কম্যান্ডার মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ মিনহাজুল আলমকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে ইউন্নীত করা হয়েছে।
এবার চোখ রাখা যাক প্রশাসনের অন্য একটি দিকে। স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের প্রাক্তন ৭৫ বছরের শহিদুল হাসান। এছাড়াও আরও চারজনকে সচিব পদে নিয়োগ করেছে সরকার। যাদের প্রত্যেকের বয়স ৬৫ থেকে ৬৯-য়ের মধ্যে। এবার তাকিয়ে দেখা যাক কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সহ দেশের সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান পদেও নিয়োগ করা হয়েছে। বিএনপি সরকার সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাদের উপচার্য হিসেবে নিয়োগ করেন, তাদের মধ্যে একজন দলের পদে রয়েছেন। বাকি ছয়জন বিএনপি পন্থী শিক্ষক সংগঠনের বর্তমান ও প্রাক্তন নেতা।
দেশের ১১টি সিটি কর্পোরেশন এবং ৪২টি জেলা পরিষদেও দেখা গিয়েছে নতুন মুখ। যাদের এসব পদে নিয়োগ করা হয়েছে, তারা সবাই বিএনপির নেতা। এদের মধ্যে অনেকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হয়েছেন। অনেকে আবার মনোনয়ন পাননি। অর্থাৎ, এদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে। এই নিয়োগ নিয়ে সরকারের তরফে একটি বিজ্ঞপ্তিও জারি করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নিয়োগ পাওয়া প্রশাসকেরা স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৪-এর ধারা ২৫ ক-এর উপধারা (৩) অনুয়ায়ী সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবেন। আইন অনুসারে তারা ভাতা পাবেন। অথচ এই বিএনপি তাদের ইস্তেহারে বলেছিল, ‘স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় সংসদ – প্রতিটি স্তরে জনগণের সরাসরি ভোটে প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সরকারে জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা হবে। ’ কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা গেল হল তারেকায়ন।












Discussion about this post