বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর জামায়াত – সহ বিরোধীদের উদ্দেশ্যে একটা বার্তা দেওয়া হয়েছে। তারা কোনও চাপের কাছে নতিস্বীকার করবে না। সেটা যে কথার কথা নয়, সেটা বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিন থেকে স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয় দিনে তো এক জুলাই যোদ্ধাকে সংসদ থেকে মার্শাল ডেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। তবে এটা শুরু হয়েছিল কিন্তু শপথগ্রহণের দিন থেকে। শপথ গ্রহণের আগে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ ইঙ্গিত দেন যে তারা সংস্কার পরিষদের শপথ নেবেন না। তিনি বলেছিলেন, “ গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হলে সেটা সংবিধানে আগে ধারণ করতে হবে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের কে শপথবাক্য পাঠ করাবেন, তার বিধান করতে হবে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের ফর্ম থাকলেও আমরা কেউ সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়নি। এছাড়া সংবিধানে এটা এখনও ধারণ করা হয়নি। যেহেতু সংস্কার পরিষদের শপথের বিধান নেই, আমরা সংবিধান মেনে এ পর্যন্ত চলছি, সামনেও চলব।”
সালাহ উদ্দিন আহমেদের ওই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, জামায়াত যদি মনে করে তারা সরকারকে চাপে রাখবে, তা হলে তারা স্বপ্নের স্বর্গে বাস করছেন। রবিবার সালাহউদ্দিন আহমেদকে এই নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। দিনটি ছিল জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের দ্বিতীয় দিন। জবাবে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “ মহামান্য রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদের অধিবেশন ডেকেছেন। সংস্কার পরিষদের অধিবেশন তো আহ্বান করেন নাই। আমরা জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এখন অংশগ্রহণ করছি সাংবিধানিকভাবে। ”
২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে উঠেছিল। উত্তাল হয়ে ওঠার কারণ ‘মেধা’ বনাম ‘কোটা’। আন্দোলনের মূল দাবি ছিল কোটা নয়, মেধা হোক ভিত্তি। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তারা কোটা চালু করে মেধাবিদের বাদ দিয়ে দলীয় অনুগতদের সুযোগ দিচ্ছে। ক্ষমতা থেকে হাসিনার সরে যাওয়া সরে যাওয়া, ১৮ মাসের ইউনূসের শাসন, তারপরে ভোট। সব কিছু অতিক্রম করে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। তবে একমাস যেতে না যেতেই এই সরকারও একই দোষে দুষ্ট বলে দাবি করল জামায়াত। রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর ২০২৫-য়ের ১৭ অক্টোবর ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ সাক্ষরিত হয়। সনদে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি ছিল সরাসরি সংবিধান সংক্রান্ত। এর মধ্যে ৩০ প্রস্তাবে একমত হয়েছিল বিএনপি। সনদটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গত বছরের ১৩ নভেম্বর ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করা হয়। এর পরপরই জনগণের সম্মতি যাচাইয়ের জন্য ২৫ নভেম্বর জারি হয় গণভোট অধ্যাদেশ। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই একই সঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ৬৮ শতাংশের বেশি ভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয়। সনদের শর্ত অনুযায়ী, নির্বাচনের ফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতির এই পরিষদের অধিবেশন ডাকার কথা ছিল, যার শেষ সময়সীমা ছিল গতকাল ১৫ মার্চ। সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে।
জামায়াত এখন বলছে বিএনপি সেই সময় ৩০ প্রস্তাবে একমত হয়েছিল। কিন্তু এখন যেহেতু তারা সরকারে, তাই তারা এখন তাদের অবস্থান থেকে সরে এসেছে। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট সংবিধান সংস্কার পরিষদেরও শপথ নিয়েছে। সংকট আরও ঘনীভূত হয় সংবিধা সংস্কার গঠন প্রক্রিয়ার আইনি ভিত্তি নিয়ে। গত রবিবার সংসদে পরিষদ অধিবেশন ডাকার বিষয়টি উত্থাপন করেন। জবাবে সালাহউদ্দিন আহমেদ সংবিধানের ৭২ নম্বর অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে বলেন, “বর্তমানে সংবিধানে এই ধরনের কোনও পরিষদের উল্লেখ নেই। তাই, সংসদের বাইরে বা সমান্তরাল কোনও পরিষদকে সংবিধান সংস্কারের পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া যাবে না।”












Discussion about this post