বাংলাদেশের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ দেড় বছরের একটি অপশাসনের মৃত্যু হয়েছে। ভোটে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছেন। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। সাদা চোখে দেখলে মনে হবে দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কি সেটা হয়েছে। ? রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বিষয়টিকে অন্যভাবে দেখছেন। বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন বা তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হওয়ার মধ্যে দিয়ে কিন্তু বাংলাদেশে গণতন্ত্র আক্ষরিক অর্থে প্রতিষ্ঠা পায়নি।
গণতন্ত্র নিয়ে বেশ কয়েকজন দার্শনিকের কিছু উক্তির উল্লেখ করতে হয়। তার আগে কিছু কথা। গণতন্ত্রের দুটি মুখ রয়েছে। একটি মুখ দেখায় ভোট, অধিকার ক্ষমতার স্বপ্ন। আর গণতন্ত্রের দ্বিতীয় মুখটি হল ক্ষমতাকে ধরে রাখা। মানুষ তবুও স্বপ্ন দেখে। কারণ, স্বপ্নই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের মানুষ আশা করেছিল, তাদের অধিকাংশ সমস্যা মিটে যাবে। দেশে ফিরবে সুদিন। কিন্তু গত ১৮ মাসে বাংলাদেশ যে কী অরাজক পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল, তা আর নতুন করে বলার দরকার পড়ে না। ফলে, তারা আরও একবার পরিবর্তনের ডাক দিয়েছিল। সেই পরিবর্তনের ডাকে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বিএনপিকে ক্ষমতায় আনেন। তারা জামায়াতকে প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে, একটা ধারণা তৈরি হয় যে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গণতন্ত্রের ধারণায় পরিবর্তন হয়েছে। তাঁর চরিত্রগত বদল হয়েছে। বিশ্বের বহু দেশে নামমাত্র গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা কায়েম রয়েছে। কিন্তু গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাই কি একমাত্র বিকল্প?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই শাসন ব্যবস্থা কোনও অবস্থাতেই বিকল্প হতে পারে না। তাছাড়া এই শাসন ব্যবস্থার বেশ কিছু ত্রুটি রয়েছে। গণতন্ত্রের জন্ম এথেন্সে। আধুনিক বিশ্বে সেটাকেই ধরা হয় শ্রেষ্ঠ শাসনব্যবস্থা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা যখন গণতন্ত্রের জয়গান গাইছেন, তখন কিন্তু চিন্তাবিদেরা এই ধরনের শাসনব্যবস্থার ত্রুট আর ফাটল ধরিয়ে দিচ্ছেন। প্রশ্ন উঠছে গণতন্ত্র কি আসলেই সেরা শাসনব্যবস্থা? বিশ্বে দুই ধরনের দেশ আছে। বিশ্বের যে সব দেশ অস্থির, জটিল ও ঝামেলায় পরিপূর্ণ সেই সব দেশের শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হয় গণতন্ত্রের মধ্যে দিয়ে। আর বাকি দেশে হয় একনায়কতন্ত্র, না হলে রাজতন্ত্র। বর্তমান বিশ্বে রাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা খুব অল্পদেশেই রয়েছে। বহু চিন্তাবিদ গণতন্ত্রের বিভিন্ন ত্রুটি নিয়ে আলোচনা করেছেন। দার্শনিক অ্যারিস্টটল গণতান্ত্রকে মুর্খের শাসন বলেছেন। সত্যি কি এই শাসন ব্যবস্থা মুর্খের শাসন। তিনি বলতে চেয়েছেন, যখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সমানভাবে দেওয়া হয়, তখন জ্ঞানী আর আর অজ্ঞানীর মতামত এক হয়ে যায়। এর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কোথায়?
তারেক রহমানের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ঝুলি শূন্য। বাবা – মায়ের সেই অভিজ্ঞতা ছিল। সেই সূত্রে তাঁর রক্তে কিছুটা হলেও সেই অভিজ্ঞতা বইছে। কিন্তু তারেক রহমান মেঠো নেতা নন। তাছাড়া তিনি দীর্ঘদিন ছিলেন প্রবাশে। বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন। আর সরকার চালাতে গেলে তাকে যে সব দলের মুখোমুখি হতে হবে, সেই সব দলের মাথারা রাজনীতির আগুনে নিজেদের দগ্ধ করেছেন। সেই সব নেতাদের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া খুব সহজ কথা নয়। সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিন কিন্তু তার একটা ইঙ্গিত মিলেছে। বাংলাদেশ সেদিন দেখেছিল তারেক সরকারকে কীভাবে বেকায়দায় ফেলে দেওয়া হচ্ছে। ফলে, দেশবাসী এখন উপলব্ধি করতে পারছেন হাসিনা ছাড়া তাদের আর কোনও গতি নেই।
তবে তাঁর ওপর অনেককিছু নির্ভর করছে। তাঁর কর্তৃত্ববাদী শাসনে দলের ভিতরে একটি পিঁপড়াও তাঁর অনুমতি ছাড়া নড়াচ়ডা করতে পারত না। তিনিও কোনও উত্তরসূরী গড়ে তুলতে পারেননি। আর রাষ্ট্রপরিচালনা করার অনেকটা জাহাজ চালানোর মতো। একজন দক্ষ নাবিক পারেন প্রবল ঝড়তুফানে জাহাজকে চালিয়ে নিয়ে যেতে। রাজনৈতিকঅভিজ্ঞতাশূন্য তারেকের কাছে সেই জাহাজ চালানো অত্যন্ত কঠিন।












Discussion about this post