২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের তীব্র আন্দোলন এবং ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময়কালে বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি গণহত্যা ঘটনোর অভিযোগ রয়েছে। এরমধ্যে জুলাই আন্দোলন দমনের নামে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের নির্দেশে একাধিক হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শুরু করে পরবর্তী মুহাম্মদ ইউনূস সরকার। পরে বিচার প্রক্রিয়াও শুরু হয় ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে। এরমধ্যে কয়েকটি মামলায় শেখ হাসিনা-সহ আওয়ামী লীগ সরকারের কয়েকজনের সাজা ঘোষণাও হয়ে গিয়েছে। যেমন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী হাসিনা এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ফাঁসির সাজা হয়েছে। কিন্তু মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জুলাই আন্দোলন এবং গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে ঘটে যাওয়া হত্যা, পুলিশ হত্যা নিয়ে কোনওরকম তদন্ত, বিচার করা যাবে না বলে এক অদ্ভুত অধ্যাদেশ জারি করেছিল। তাতে বলা হয়েছিল, জুলাই আন্দোলনে যুক্ত থাকা কোনও ব্যক্তির প্রতি মামলা, মোকদ্দমা বা বিচার হবে না। অর্থাৎ তাঁদের দায়মুক্তি দেওয়া হল। বাংলাদেশে এখন সরকার পরিবর্তন হয়েছে। ইউনূস সরকারের বিদায় ঘটিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বাংলাদেশে। কিন্তু ইউনূসের জারি করা অধ্যাদেশগুলি এখনও রয়ে গিয়েছে। কিন্তু বিএনপি আমলেও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশ সদস্যদের হত্যার ঘটনায় জাতীয় নাগরিক পার্টির অন্যতম মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া-সহ মোট ৪২ জনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। উল্লেখ্য, ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একজন অন্যতম উপদেষ্টা ছিলেন আসিফ মাহমুদ। কিন্তু সেই মামলা শুনানির আগেই খারিজ করে দিলেন ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট। যা নিয়ে তুমুল আলোচনা শুরু হয়েছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আঙ্গিনায়।
ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে যাত্রাবাড়ী থানার ওসি আবুল হোসেনের ছোট ভাই জালাল হোসেন এই মামলার আবেদন করেছিলেন। মামলার আবেদনে অভিযোগ করা হয়,৫ অগাস্ট বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে আসিফ মাহমুদের নেতৃত্বে আন্দোলনকারীরা যাত্রাবাড়ী থানার সামনে অন্তত ৭-৮টি গাড়ি পুড়িয়ে লুটপাট করা হয়। ‘হামলা ও ভাঙচুর’ করে থানা নিজেদের ‘নিয়ন্ত্রণে’ নিয়ে নেন হামলাকারীরা। থানার ভিতরে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ নথিতে ‘আগুন’ ধরিয়ে দেওয়া হয়। এই পর্যায়ে যাত্রাবাড়ি থানার তৎকালীন ওসি আবুল হোসেন-সহ ১২ জনকে ‘কুপিয়ে হত্যা’ করার অভিযোগ ওঠে আসিফ মাহমুদ এবং তার সহকারীদের বিরুদ্ধে। সেই সময়কার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা আসিফ মাহমুদ ছাড়াও অন্যান্য অভিযুক্তরা হলেন, সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ, আব্দুল কাদের, আবু বাকের মজুমদার, রিফাত রশিদ, হাসিব আল ইসলাম, নুসরাত তাবাসসুম, উমামা ফাতেমা, আরিফ সোহেল। কিন্তু এই মামলা গ্রহণই করল না আদালত। ফলে প্রশ্ন হচ্ছে কেন আবেদন খারিজ করা হল। তাহলে কি বিএনপি সরকারও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মতো এক পথে হাঁটছে?
আপনাদের নিশ্চই মনে রয়েছে এই মামলায় অন্যতম অভিযুক্ত হাসিব আল ইসলামের কথা? ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসিব আল ইসলাম একটি টেলিভিশন টক শো-তে প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন, বি-টিভি ভবন, মেট্রোরেলে অগ্নিসংযোগ এবং পুলিশ হত্যা নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্য দিয়েছিলেন। তিনি স্বীকার করে নিয়েছিলেন যে এই হিংসার ঘটনাগুলি তাঁরাই ঘটিয়েছিলেন। যা নিয়ে তীব্র বিতর্ক হয়েছিল। পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সমন্বয়ক হাসিব আল ইসলামকে শোকজ করেছিল। কিন্তু ইউনূসের অধ্যাদেশের জন্য তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও রকম ব্যবস্থা নিতে পারেনি পুলিশ বা প্রশাসন। অনেকেই আশা করছিলেন নতুন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে গণঅভ্যুত্থানের পর ঘটা একাধিক হত্যা মামলার বিচার হবে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল উল্টো চিত্র। ঘটনা হল, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপির নতুন সরকার শপথ গ্রহণের কয়েকদিন পর জুলাই আন্দোলনের সময়কার পুলিশ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নিয়ে সরকারের দুজন মন্ত্রী দুই রকম তথ্য দিয়েছিলেন। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল বলেছিলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে পুলিশ হত্যার তদন্তের বিষয় নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেটা বলেছেন, সেটাই হবে এবং দ্রুত তদন্ত করা হবে। কিন্তু এরপরই বাংলাদেশের নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেছিলেন, আমি তো এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দিইনি। মহাসচিব কী বলেছেন, আমি জানি না। ফলে একটা বিশ্বান্তি তৈরি হয়েছে। ওয়াকিবহাল মহল বলছে, জুলাই জাতীয় সনদের অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করেছে বিএনপি। সেই সনদেই ছিল জুলাই অভ্যুত্থানে যারা নেতৃত্ব দিয়েছে, অংশগ্রহণ করেছে, তাদেরকে আইনি সুরক্ষা দিতে হবে এবং সাংবিধানিক সুরক্ষা দিতে হবে। সেই কারণেই হয়তো সিদ্ধান্ত নিতে সময় নিচ্ছে তারেক রহমানের সরকার।












Discussion about this post