সাহস নয়, একে দুঃসাহস বলাই যেতে পারে। একই সঙ্গে এই প্রশ্ন করা যেতে পারে, বাংলাদেশে সত্যিই কি বদল হয়েছে? প্রশ্ন তোলার কারণ স্বাধীন বাংলাদেশে ঘটা করে পালিত হল পাকিস্তান দিবস। যে দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি স্বাধীন দেশের জন্ম হয়েছিল, যে দেশের হার্মাদরা নির্বিচারে হত্যালীলা চালিয়েছিল, সেই দেশে কী করে পাকিস্তান দিবস পালিত হল?
পাকিস্তানের জাতীয় দিবস উপলক্ষে ঢাকায় পাকিস্তান হাইকমিশনে এক আনুষ্ঠানিক পতাকা উত্তোলন করা হয়। সোমবার (২৩ মার্চ) পাকিস্তানি সম্প্রদায়ের সদস্য, শিক্ষার্থী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং স্থানীয় গণমাধ্যমের উপস্থিতিতে হাইকমিশনার ইমরান হায়দার পতাকা উত্তোলন করেন। পরে হাইকমিশন থেকে একটি বিবৃতি জারি করা হয়। সেই বিবৃতি প্রতিবেদনে তুলে ধরার আগে অনুষ্ঠান নিয়ে দু-চার কথা। অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আসিফ আলী জারদারি, প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শাহবাজ শরীফ এবং উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ইসহাক দারের বার্তা পাঠ করে শোনানো হয়, যেখানে দিনটির তাৎপর্য তুলে ধরা হয় এবং অগ্রগতি ও ঐক্যের প্রতি পাকিস্তানের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
বার্তায় নেতৃবৃন্দ পুনরায় ব্যক্ত করেন যে, পাকিস্তান বিশ্ব শান্তির সমর্থক, তবে দক্ষিণ এশিয়ায় টেকসই শান্তির জন্য জম্মু ও কাশ্মীর বিবাদের ন্যায্য সমাধান জরুরি। তারা বলেন, আমরা ভারতীয় অবৈধভাবে দখলকৃত জম্মু ও কাশ্মীরে (আইআইওজেকে) আমাদের ভাই ও বোনদের নৈতিক, রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক সমর্থন অব্যাহত রাখব। ফিলিস্তিনের জনগণের প্রতিও সংহতি প্রকাশ করেন নেতৃবৃন্দ। তারা ‘অপারেশন গজব-লিল-হক’ সন্ত্রাসবাদ এবং বিনা উসকানিতে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় সংকল্পের প্রতীক বলে উল্লেখ করেন। পরিষদের নেতারা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পমাল্য অর্পণ করেন। এরপরই একে একে সুপ্রিম কোর্ট, সচিবালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইনসহ সমস্ত সরকারি-বেসরকারি ভবনে পাকিস্তানের চাঁদ-তারা পতাকার বদলে সগৌরবে উত্তোলন করা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা।
সেদিন ঠিক কী হয়েছিল? সকাল ৯টায় আউটার স্টেডিয়ামে ‘জয় বাংলা বাহিনী’র সদস্যরা সামরিক কায়দায় কুচকাওয়াজ ও যুদ্ধের মহড়া প্রদর্শন করেন। পল্টন ময়দানে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন পতাকা ওড়ায়। একমাত্র ক্যান্টনমেন্ট, প্রেসিডেন্ট ভবন, গভর্নর হাউস, তেজগাঁও বিমানবন্দর ছাড়া কোথাও পাকিস্তানের পতাকার চিহ্ন পাওয়া যায়নি। হাইকমিশনার বাংলাদেশে বসবাসরত পাকিস্তানি প্রবাসীদের অভিনন্দন জানান। পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য প্রতিষ্ঠাতাদের আত্মত্যাগের প্রতি তিনি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি এই ঐতিহ্যকে স্মরণ করার এবং কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর স্বপ্ন অনুযায়ী একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ পাকিস্তান গড়ার জন্য সম্মিলিত সংকল্প নবায়নের ওপর জোর দেন।
১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ, আসলে কী ঘটেছিল? সেদিনইতিহাসের খেরোখাতা উল্টে দেখে আসা যাক। ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি ছিল ‘পাকিস্তান দিবস’। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের স্মরণে প্রতিবছর এই দিনে দেশজুড়ে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা উড়ত, চলত সামরিক কুচকাওয়াজ। কিন্তু একাত্তরের মার্চ ছিল ভিন্ন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে অসহযোগ আন্দোলনে উত্তাল বাংলা সেদিন পাকিস্তান দিবসকে প্রত্যাখ্যান করে পালন করল এক অনন্য ‘প্রতিরোধ দিবস’। তার নির্দেশে এদিন সাধারণ ছুটি পালিত হয়। ভোর হতেই এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের সাক্ষী হয় ঢাকা। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ডাকে ছাত্র-জনতা আজিমপুর কবরস্থানে ভাষা শহীদসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দিবসটির সূচনা করেন।
প্রতিরোধ দিবসের এই চেতনা শুধু রাজপথেই সীমাবদ্ধ ছিল না, ছড়িয়ে পড়েছিল ঘরে ঘরে। মিরপুরের ৬ নম্বর সেকশনের ডি-ব্লক, ১২ নম্বর রোডের বাড়িতে তরুণ কবি মেহেরুন্নেসা তার দুই ভাইকে নিয়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে দিতে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলন করেন। এই ঘটনা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও পাকি যোদ্ধাদের বংশধরেরা এখনও সেখানে রয়ে গিয়েছে।












Discussion about this post