মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নামে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেফতার দেখানোর বিষয়ে আগামী ৯ এপ্রিল শুনানির দিন নির্ধারণ করেছেন আদালত। তাঁর বিরুদ্ধে ১১৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। ঢাকার সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক মঈনুদ্দিন চৌধুরী আসামির উপস্থিতিতে এ শুনানি অনুষ্ঠিত হবে বলে নির্দেশ দিয়েছেন। ২০০৭-০৮ সময়ের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের আলোচিত সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি রিক্রুটিং এজেন্সির এমডি। ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি জাতীয় পার্টির টিকেটে ফেনী-৩ আসন থেকে এমপি হয়েছিলেন। ওই কোম্পানির মাধ্যমে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগেইগত ১১ মার্চ মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীসহ অন্যদের বিরুদ্ধে এ মামলা করে দুদক। মঙ্গলবার রাজধানী পল্টন থানায় দায়ের করা একটি মানবপাচার মামলায় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেফতার দেখানো হয়। ওই মামলায় পুলিশের আবেদনের পর আদালত তাঁকে পাঁচদিনের রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দেন।
সোমবার গভীর রাতে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা বারিধারা ডিওএইচএস এলাকায় তাঁর বাড়ি থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে। প্রাক্তন এই সেনাকর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, ‘তারা সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকার চেয়ে অতিরিক্ত টাকা গ্রহণ করে মালয়েশিয়া শ্রমিক রিক্রুটের জন্য এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ পান। নিয়োগের পর তাদের থেকে আরও টাকা দাবি করতেন। তাঁর মাথায় হাত ছিল এক দলীয় এমপির। প্রাক্তন এই সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, ৭ হাজার ১২৪ জন কর্মীকে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর ক্ষেত্রে পাসপোর্ট, স্বাস্থ্য পরীক্ষার নামে নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত অর্থ নিয়ে মোট ১১৯ কোটি ৩২ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেন। বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশনের তরফে আদালতে বলা হয়েছে, অভিযুক্তের জামিন মঞ্জুর করলে তিনি তদন্তে প্রভাব খাটাবেন। কারণ, তাঁর সঙ্গে বিএনপি সরকারের এক মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। কে এই মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী?
২০০৭ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসির দায়িত্বে ছিলেন এই মেজর সাহাবুদ্দিন চৌধুরী। ১/১১-য়ের পট পরিবর্তনের পর তাঁর পদোন্নতি হয়েছিল। তিনি মেজর থেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে উন্নীত হন। সেই সময় আলোচিত গুরুতর অপরাধ দমন সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয়ক কমিটির সমন্বয়ক ছিলেন। কমিটির প্রধান ছিলেন সেই সময়ের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এম এ মতিন। তবে জরুরী অবস্থায় ওই সময়ে পর্দার আড়াল থেকে জেনারেল মাসুদই যৌথহবাহিনীর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করতেন বলে একটা ধারণা তৈরি হয়। বলা হয়, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি এবং ফখরুদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সেনাকর্মকর্তাদের একজন ছিলেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।
প্রাক্তন দুই প্রধানমন্ত্রী, যার মধ্যে একজন প্রয়াত, তাদের এবং তারেক রহমানকে সে সময় গ্রেফতার করে দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগে মামলা রুজু করা হয়। ২০০৮ সালের জুনে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার করে পাঠানো হয়। পরের বছর ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। জাতীয় রাজনীতির পট পরিবর্তনের পরেও কিন্তু তাকে তাঁর পদে রেখে দেওয়া হয়। এমনকী অবসরের সময় হয়ে গেলে তাঁর চাকরির মেয়াদ ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়। বাহিনী থেকে অবসরের পর ঢাকায় খোলেন একটি বিলাসবহুল হোটেল। শুরু করেন ব্যবসা। হোটেল ব্যবসার পাশাপাশি জনশক্তি রফতানিরও ব্যবসা শুরু করেন এই প্রাক্তন সেনাকর্মকর্তা। এই গ্রেফতার কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এই বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ১/১১ সংক্রান্ত বই ‘এক এগারোর’ লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ওয়ান ইলেভেনের সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের একজন এই প্রাক্তন সেনাকর্মকর্তা। মাসুদ চৌধুরীর গ্রেফতারের পর বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু মঙ্গলবার তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুকে লেখেন, ‘১/১১’ তে গণতন্ত্রের হত্যাকারীকে গ্রেফতারের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ।’












Discussion about this post