স্বাস্থ্য। যে কোনও সরকারের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রক হল এই স্বাস্থ্য। প্রতিটি দায়িত্বশীল সরকার এই খাতে মোটা টাকা অর্থ বরাদ্দ করে থাকে। তার কারণ একটাই। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে তার প্রভাব পড়ে সর্বত্র। খুব বেশি পিছনে যাওয়ার দরকার পড়ে না। কোভিডের কথাই ধরা যাক। বিশ্বে রোগটি মহামারি আকারে ধরা পড়েছিল। মৃত্যু হয়েছে বহু মানুষের। স্বাস্থ্য পরিকাঠামো কার্যত ভেঙে পড়েছিল। প্রভাবের হাত থেকে রেহাই পায়নি ভারতও। আমেরিকার মতো আর্থিক দিক দিয়ে শক্তিশালী একটি দেশের ওপরেও ব্যাপক প্রভাব পড়ে। প্রভাব পড়ে অর্থনীতি, স্বাস্থ্যাখাতে। দেশটি আর্থিক ও স্বাস্থ্যখাত মজবুত হওয়ায় কোভিডের পর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে শুরু করে।
ভারতের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এই দেশেও বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালের বেড রোগীর ভিড়ে উপচে পড়েছিল। কিন্তু স্বাস্থ্যখাত ও অর্থনীতি মজবুত থাকায় কোভিড পুরোপুরি ভারতের নিঃশেষ করতে পারেনি। কারণ স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি হয়নি। আর স্বাস্থ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আর একটি বিষয়- পরিবারকল্যাণ মন্ত্রক। দুটি দফতর বা মন্ত্রক যে কোনও দেশের সরকার প্রাধান্য দিয়ে থাকে। অথচ পদ্মাপারে পূর্বতন তদারকি সরকার এই স্বাস্থ্যখাতেও দুর্নীতি করেছে। শুধু কি স্বাস্থ্যখাত? এমন একটি মন্ত্রক নেই যে মন্ত্রকে আগের সরকার কোনও দুর্নীতি করেনি। ড. ইউনূস ও তাঁর উপদেষ্টা পরিষদের অধিকাংশ সদস্যের বিরুদ্ধে প্রতিদিনই নতুন নতুন দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতা হস্তান্তরের পর এই অভিযোগের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পর্যন্ত সর্বত্রই অভিযোগের বন্যা দেখা যাচ্ছে। অভিযোগ কেবল প্রধান উপদেষ্টা বা উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের নয়; সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম, সাবেক ডেপুটি প্রেস সচিব মোহম্মদ আবুল কালাম আজাদ মজুমদার, সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ. মনসুরের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছে। এবার অভিযোগ উঠল স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতির। আর সেই দুর্নীতির পর্দা ফাঁস করেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক মঞ্জুর আলম পান্না। দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে তাঁর অত্যন্ত আস্থাভাজন নূরজাহান বেগমের বিরুদ্ধে। তাঁকে উপদেষ্টা পরিষদে অন্তর্ভুক্ত করার পর থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
বাংলাদেশের বিশিষ্ট এই সাংবাদিকের বয়ান অনুযায়ী, ‘নূরজাহান বেগমের বিরুদ্ধে পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নসংক্রান্ত একটি প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সেখানে ৯ হাজার কোটি টাকার নয়-ছয় করা হয়েছে। একটি কম্পিউটারের দাম ধরা হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৮৫ হাজার টাকা, যেখানে বাজারে ভালো মানের একটি কম্পিউটারের মূল্য সাধারণত ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার মধ্যে। প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।’ শুধু কি কম্পিউটার কেনা নিয়ে টাকা নয়ছয়? মন্ত্রকের কর্মকর্তাদের ভ্রমণ জন্য প্রায় ১৩৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়। প্রকল্পটি একনেকে (জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি) উপস্থাপনের সময় দ্রুত অনুমোদনের চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। মঞ্জুর আলম পান্নার বয়ান অনুসারে, ‘নূরজাহান বেগমের তত্ত্বাবধানে নিয়োগ, বদলি, পরামর্শক নিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।’
যদিও এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এখনও সম্পন্ন হয়নি, তবু বিষয়গুলো জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়ে থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীত ও বর্তমান সব সময়ের অভিযোগই স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনা উচিত। হাজার হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসছে।
বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে পালাবদলের পর প্রশ্ন উঠছে, তদারকি সরকারের আমলে যে সব দুর্নীতি হয়েছে, তার তদন্ত হবে কি না? দোষীদের শাস্তি দেওয়া হবে কি না?











Discussion about this post