আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল, সংক্ষেপে আইসিটি। এটি তৈরি গঠন করেছিলেন শেখ হাসিনা। উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযোদ্ধা বিরোধীদের বিচার প্রক্রিয়ায় আনা। হাসিনা সরকারের পতন ঘটতেই এই আইসিটি তদারকি সরকারের দমনপীড়নের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। বেছে বেছে আওয়ামী লীগাদের টার্গেট করা হয়। হাসিনা, তাঁর আমলের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জমান খান কামালের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী কাজে লিপ্ত থাকার অভিযোগ এনে মামলা করা হয়েছে। আইসিটি তাদের মৃত্যদণ্ডে দণ্ডিত করে। হাসিনা রয়েছেন দিল্লিতে। তবে আসাদুজ্জামান খান কামাল কোথায় রয়েছেন, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনও ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। সেনাবাহিনীর বেশ কয়েকজন কর্মরত এবং প্রাক্তন সেনা সদস্যের বিরুদ্ধেও মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই সেনা সদস্যরা আওয়ামীপন্থী বলেই পরিচিত। এই আইসিটিকে ঘিরে ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ হল সেটলিং সিন্ডিকেটের।
খোদ ট্রাইবুন্যালের এক প্রসিকিউটরের দাবি এই আইসিটি আসলে টাকা লেনদেনের একটি চ্যানেলে পরিণত করেন পূর্বতন তদারকি সরকার। ‘রাজসাক্ষী’ করার পিছনে মোটা টাকা লেনদেন হয়েছে। ট্রাইবুন্যালের প্রসিকিউটর বিএম সুলতান মাহমুদ বাংলাদেশের একটি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘প্রসিকিউশন টিমের ভিতরে কয়েকজনের একটি প্রভাবশালী চক্র গড়ে ওঠে। চক্রের কাজ ছিল গুরূত্বপূ্র্ণ আসামীদের রাজসাক্ষী তৈরি করা। এর জন্য তাদের থেকে নেওয়া হত মোটা টাকা। কিছু ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ভিডিও বা সাক্ষ্যপ্রমাণ থাকার পরেও তাদের আসামি না করে রাজসাক্ষী করা হয়েছে। আবার কিছু মামলার ক্ষেত্রে সীমিত সংখ্যক আসামী রেখে বাকিদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এই নিয়ে রীতিমতো বিতর্ক তৈরি হয়েছে।’ যদিও এই আইসিটির চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর (প্রশাসন) গাজী এম এইচ তামিম যাবতীয় অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তবে আইসিটিতে যে দুর্নীতি হয়েছে, সেটা স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে তারেক রহমানের কয়েকটি পদক্ষেপে। তাজুলকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই অপসারণ থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে দুর্নীতি, কুকীর্তির যাবতীয় তথ্য সরকারে হাতে পৌঁছে গিয়েছে। তাজুল প্রসিকিউশন দলের এক সদস্য সুলতান মামুদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পোস্ট লেখেন। সেখানে তিনি সবিস্তারে তুলে ধরেন আইসিটি কীভাবে দুর্নীতির আঁতুড়ঘর হয়ে উঠেছিল। বিএনপি সরকার গঠনের পর আইসিটির দুর্নীতির তদন্ত শুরু করেছে। সুলতান মামুদের পোস্টের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন প্রাক্তন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লা আল মামুন। পূর্বতন তদারকি সরকার তাঁকে রাজসাক্ষী করে। ফেসবুক পোস্টে ওই আইনজীবী শিরোনাম ছিল “ট্রাইব্যুনালে সেটলিং বাণিজ্য ও রাজসাক্ষী নাটক: কেন সরতে হচ্ছে তাজুল ইসলামকে।” এই আইসিটিতে বিচার চলছে ১৫ জন সেনাকর্মকর্তার। প্রশ্ন এখানেই। যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যায় এই ১৫ জন কোনও না কোনও অপরাধে জড়িত, তাহলে তাদের বিচার তো সেনা আদালতে হওয়ার কথা। কোন আইনে পূর্বতন সরকার এই ১৫ জনকে আইসিটির আওতায় নিয়ে এসেছে। তারেক রহমান সরকার গঠনের পর যে সব বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেন, তার মধ্যে ছিল আইসিটি।
২০২৫ সালের আইসিটিতে তিনটি মামলার চার্জশিট জমা পড়ে। এই তিনটি মামলার মধ্যে দুটি ছিল গুম ও খুনের। আর অপর মামলাটি ছিল জুলাই-অগাস্টে সংঘটিত মানবতা বিরোধী অপরাধের। তিনটি মামলার চার্জশিটে ২৫জন সেনাকর্মকর্তার নাম ছিল। যার মধ্যে ১৫জন কর্মরত। তাদের সেনা হেফাজতে নেওয়া হয়। এই ১৫ জনের মধ্যে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতরের তিনজন, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটিলিয়নের (র্যাব) ১০ জন, বিজিবির দু’জন রয়েছেন। মামলার পরবর্তী শুনানি ২৯ মার্চ, ৩১ মার্চ এবং ৭ এপ্রিল হওয়ার কথা। নতুন প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, অতীতে দেওয়া সব মামলা ও মামলার রায় খতিয়ে দেখা হবে। একই বক্তব্য দিতে দেখা যায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে। আর তাতেই ফেঁসে গিয়েছেন পূর্বতন তদারকি সরকার প্রধান।












Discussion about this post