মার্কিন ও ইজরায়েল জোটের ইরানের যুদ্ধ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। তার আঁচ পড়েছে পাকিস্তানেও। এই যুদ্ধ পারস্য উপসাগর অতিক্রম করে এখন ইসলামাবাদে আছড়ে পড়েছে। পরিস্থিতি রীতিমতো জটিল। পাকিস্তানের ভারসাম্য রক্ষার নীতি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। একদিকে বন্ধুসম ইরান, অপর দিকে আজীবনের দাতা সৌদি আরব, সমরাস্ত্রের জোগানদাতা আমেরিকা। এই তিন রথের চাকায় পিষ্ট হচ্ছে পাকিস্তান।
পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই সৌদি আরব এবং ইরানের পারস্পরিক প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ের অন্যতম ক্ষেত্র। বলা হচ্ছে, সৌদি আরব এবং ইরানের মধ্যে চিন সমঝোতা করিয়ে দেয়। সেখনে ইসলামাবাদেও ভূমিকা ছিল। তবে এখন সেই নিরপেক্ষ ভূমিকা টিকিয়ে রাখা পাকিস্তানের কাছে পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানের পক্ষে এই মুহূর্তে কোনওভাবেই নতুন কোনও অস্থিরতা মেনে নিতে পারবে না। একদিকে ইরান বিভিন্ন দেশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে, সৌদি আরবের মতো দেশগুলি পাল্টা ব্যবস্থার কথা ভাবছে। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সামনে একটাই রাস্তা খোলা আছে। রাস্তাটি হল কূটনৈতিক তৎপরতা।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লা খামেইনির মৃত্যুর পর পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া ছিল কৌশলী। ঘটনায় তারা কঠোর নিন্দা জানানোর পরিবর্তে কেবলমাত্র উদ্বেগ প্রকাশ করে একধরনের দায়সারা বক্তব্য দিয়েছে। আর উপসাগরীয় দেশগুলির ওপর যখন হামলা হল, সেই সময় ইসলামাবাদ প্রতিক্রিয়া দিতে দেরি করেনি। লক্ষ্য করার মতো বিষয় হল পাকিস্তান কিন্তু আমেরিকার সমালোচনা করেনি। এর কারণ, ট্রাম্পের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বর্তমানে ইরান ইস্যুতে অনেকটাই না কি পাকিস্তানের ওপর নির্ভরশীল। পাক সেনাপ্রধান আসিম মুনির ট্রাম্পের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। গাজা সমস্যা নিয়ে ট্রাম্পের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং আফগানিস্তানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে আমেরিকা খোলাখুলি পাকিস্তানকে সমর্থন করছে।
পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করার সিদ্ধান্তটিকেও অনেকে সরকারের ‘বড় ভুল’ হিসেবে দেখছেন। দেশের বুদ্ধিজীবী মহল ও সাধারণ জনগণের একটি বড় অংশ এত ক্ষুব্ধ যে তাঁরা বলছেন, পাকিস্তান সরকার কার্যত বিক্রি হয়ে গেছে। সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষাচুক্তির দোহাই দিয়ে পাকিস্তানের বিদেশমন্ত্রী যুদ্ধের দিকে জড়িয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। সেই সময় পাকিস্তানের রাজপথ উত্তাল। মানুষ রাস্তায় নেমে সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেছে। তখনই দেশের রাজপথে ক্ষোভ ফুঁসছে। করাচিতে মার্কিন দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভরত জনতার ওপর গুলি চালানোর ঘটনায় পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়েছে। এই উত্তপ্ত পরিবেশে করাচি ও লাহোরের রাস্তাঘাট বন্ধ করে এবং শিয়া–অধ্যুষিত এলাকায় কারফিউ দিয়ে প্রতিবাদ দমানোর চেষ্টা করেছে দেশটির প্রশাসন। পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে পাকিস্তানের লাখ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি পাকিস্তানের ওপর পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে আবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইজরায়েল সফরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাতে ইসলামাবাদের চিন্তার ভাঁজ আরও চওডা হচ্ছে। চারিদিক থেকে পাকিস্তানকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। পাকিস্তান এখন অনেকটাই দিগ্ভ্রান্ত অবস্থায় আছে। সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সঠিক পক্ষ বেছে নিতে ব্যর্থ হওয়ায় সরকার এখন নিজের দেশেই প্রশ্নের মুখে। ভারত ও আফগানিস্তান সীমান্তে পাকিস্তান যখন প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবিলা করছে, তখন এই বহুমুখী কূটনৈতিক চাপ সামাল দিতে না পারলে দেশ এক অপূরণীয় সংকটের কবলে পড়বে। বিশ্লেষকদের ধারণা, পাকিস্তান সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চাইবে না। তবে পরিস্থিতি তৈরি হলে সৌদি আরবকে আকাশ প্রতিরক্ষা বা সীমিত সামরিক সহায়তা দিতে পারে। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা করবে ইসলামাবাদ। তাদের মতে, এই সংকটে পাকিস্তানের সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা হতে পারে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করা এবং দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া।












Discussion about this post