প্রতিবেদন শুরু করা যাক ব্রিটেনের আয়রন লেডি মার্গারেট থ্যাচারের যুদ্ধ নিয়ে একটি উদ্ধৃতি দিয়ে।
থ্যাচার বলেছিলেন, “যুদ্ধ কখনই একটি দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন থাকে না। এই দাবানলের মতো তার চারপাশের সব কিছুকে সে গ্রাস করতে উদ্যত হয়।” থ্যাচারের এই মন্তব্য বৈশ্বিক বাস্তবতায় আরও বেশি সত্য বলে মনে হয়। কারণ, আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধ ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং ক্ষেপণাস্ত্রের অস্ত্র যেখানে শোনা যায়, তার অর্থনৈতিক প্রতিধ্বনি অনেক সময় হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের দেশেও পৌঁছে যায়। ইরানকে ঘিরে বর্তমান সংঘাত সেই বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
আমেরিকা ও ইরানের এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তাঁর অভিঘাত তেল আভিব বা ওয়াশিংটনে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং, ধাক্কা এসে লাগতে পারে ঢাকার অর্থনীতিতেও। এই জায়গাতে বাংলাদেশের উদ্বেগ শুরু হয়। বাংলাদেশ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন দেশটি অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক রূপান্তর এবং বিশ্ববাজারের অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে যদি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আরও বড়ো আকার নেয়, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য হবে মরার ওপরে খাঁড়ার ঘা। যুদ্ধের প্রথম প্রভাব সাধারণত দেখা যায় জ্বালানি বাজারে। ১৯৭০ সালে তেলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের কারণে দাম বেড়েছিল ৩০০% । কারণ বিশ্ব অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধমনী হল পারস্য উপসাগরের সরু কিন্তু অত্যন্ত কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালী। বিশ্বে যত তেল সরবরাহ হয় তার ১/৫ অংশ এই প্রণালী দিয়ে প্রবাহিত হয়।
মধ্যেপ্রাচ্যের যুদ্ধ আপাত দৃষ্টিতে দুই থেকে তিনটি দেশের মধ্যে হলেও এই যুদ্ধের প্রভাব গিয়ে পড়ে মধ্যেপ্রাচ্যের ১০ থেকে ১৫টি দেশে। দেশগুলি হল বাহরিন, জর্ডন, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, ইরাক, ইয়েমেনে একের পর এক মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে ইরাক। আর সেখানে কর্মরত লাখ লাখ বাংলাদেশি, যারা অন্ন আর বস্ত্রের জন্য ওই সব দেশে গিয়েছিল, তারা এখন গুরুতর সমস্যায় পড়েছে। বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য মধ্যপ্রাচ্য বড়ো একটা আশ্রয়স্থল। ২০২৫ সালে বিদেশে যাওয়া ১৯ লক্ষ ৩০ হাজার ৭৫৭ জন কর্মীর মধ্যে প্রায় ৬৭ শতাংশ কর্মীর ঠিকানা ছিল সৌদি আরব। ৯০ শতাংশ কর্মী যান মাত্র পাঁচটি দেশে। আর মালয়েশিয়া, ব্রুনাইয়ের মতো দেশগুলি বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ এখন পুরোপুরি মধ্যপ্রাচ্য নির্ভর। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বর্তমান শ্রমবাজারকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। প্রতিটি পরিবারের বাঁচার জন্য ঋণ নেওয়া একটি মাত্র রাস্তা।
এদিকে আবার সৌদি কর্তৃপক্ষ ভিসার ব্যাপারে কড়াকড়ি করেছে। বাংলাদেশ থেকে যে সব কর্মীর আসার প্রয়োজন নেই বা সে দেশে থেকে যাদের বিনা প্রয়োজনে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে, সৌদি আরব তাদের সে দেশে প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে না। আবার কিছু ক্ষেত্রে তারা দেখেছে ভিসা এবং সেই সংক্রান্ত কাগজপত্র ভূয়ো। তাদের আর কোনওভাবেই তারা সৌদি আরবে যেতে দিতে চাইছে না। এবারের সংঘাতের বিশেষত্ব হল ঘোষিত লক্ষ্য কেবল প্রতিরোধ বা প্রতিশোধ নয়, বরং শাসন ব্যবস্থা বদলে দেওয়া। ইতিহাস বলে, যখন কোনও রাষ্ট্র তার রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে লড়াই করে, তখন সংঘাত দীর্ঘায়িত ও তীব্র হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে য়ায়।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পর প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা ও তাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তিনি মন্ত্রকের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ডাকেন। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ও প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক, অসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামা মিল্লাত। পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে দুজন বাংলাদেশি নিহত ও পাঁচজন আহত হয়েছেন। রাষ্ট্রদূতেরা সেখানে গিয়েছেন। কুয়েত, বাহরাইন ও কাতারের মন্ত্রীদের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা আমাদের নাগরিকদের পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন।












Discussion about this post