নাম বদল একটি প্রবণতা। ইতিহাস সেই প্রবণতার সাক্ষী বহন করছে। ক্ষমতা যে দলের হাতে থাকে, তারা তাদের মতন করে ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের নাম বদলে দিয়ে থাকে। কনস্টানটিনোপল নগরী অটোমান সাম্রাজ্যের হাত ধরে হয়ে উঠেছিল ইস্তাম্বুল। সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরটি সোভিয়েত আমলে বদলে গিয়ে হয়ে উঠল লেলিনগ্রাদ। নাম বদলের প্রবণতা দেখা গিয়েছে এই ভারতেও। মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তারা একে একে ঐতিহাসিকস্থানের নাম বদল করতে শুরু করে। গয়া স্টেশনের নাম বদলে করা হয় পণ্ডিত দীন দয়াল উপাধ্যায় স্টেশন। এলাহাবাদ স্টেশনের নাম বদলে করা হয় প্রয়াগ রাজ। প্রধামন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দফতরের নাম বদলে রাখা হয় সেবা তীর্থ। রাজভবন এবং রাজনিবাসের নাম বদলে করা হয়েছে লোক ভবন, লোক নিবাস। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরার আমলে তৈরি হওয়া অমর জওয়ান জ্যোতির শিখা পাঁচ দশক পর নিভিয়ে দেন প্রধামন্ত্রী মোদি। ইতিহাসের দিক থেকে ভারতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব রয়েছে, মোদি সরকার সেই সব ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের নাম বদলে দিয়েছেন। তা নিয়ে কম বিতর্ক তৈরি হয়নি। তবে সব থেকে বেশি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে অমর জওয়ান জ্যোতির শিখা নিভিয়ে দেওয়ার বিষয়টি। অমর জওয়ান জ্যোতিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সেখান থেকে আধ কিলোমিটির দূরে ন্যাশনাল ওয়ার মেমোরিয়ালে। ২০১৯ সালে লোকসভা ভোটের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইন্ডিয়া গেট চত্বরে ‘ন্যাশনাল ওয়ার মেমোরিয়াল’-এর উদ্বোধন করেন।
বাংলাদেশেও পূর্বতন তদারকি সরকারের আমলে দেখা গিয়েছে এই নাম বদলের প্রবণতা। বাছাই করে সেই সব প্রতিষ্ঠানের নাম বদলের চেষ্টা হয়েছে, যেই সব প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব রয়েছে। আর নাম বদল করে যার প্রতি আগের সরকার শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের পরিকল্পনা নেয়, সে কিন্তু কোনও ঐতিহাসিক ব্যক্তি ছিলেন না। তাঁর পরিচয় তিনি একজন ভারত-বিদ্বেষী নেতা – শরিফ ওসমান হাদি। গত ১৮ মাসে তদারকি সরকার একের পর এক দুর্নীতি করে গিয়েছে। সেই দুর্নীতির একটি অংশ হল এই নাম পরিবর্তন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখ মুজিবের নাম যে প্রেক্ষাগৃহ রয়েছে, সেই প্রেক্ষাগৃহের নাম বদলে ফেলার চেষ্টা চালায় তদারকি সরকার। হাদি হত্যার পর তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ফলক কালো কালিতে মুছে দেওয়া হয়। সেখানে লেখা হয় শহীদ ওসমান হাদি হল।
হাদির প্রতি পূর্বতন সরকারের যে বিশেষ ভালোবাসা ছিল, তা আর নতুন করে বলার দরকার পড়ে না। যাকে বলা হয় বিগলিত প্রাণ। গালাগালিকে তিনি একটি শিল্পে পরিণত করেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে দেখেছিলাম, জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে তিনি কীভাবে এই ভারত-বিদ্বেষী নেতার প্রশংসা করেছে। বিদ্রোহী কবির সমাধির পাশে এই ‘জঙ্গি যোদ্ধা’-কে সমাহিত করেছেন। প্রশ্ন উঠেছিল, কবির পাশে একজন জঙ্গিনেতাকে কি সমাধি দেওয়া যায়? যদিও তদারকি সরকার এই সব বিষয়ে কর্নপাত করেনি। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেক্ষাগৃহের নাম বদল হচ্ছে না বলে কিন্তু সরকারের তরফে এখনও পর্যন্ত কিছু বলা হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশের নাম পরিবর্তনের পিছনে রয়েছে সংকীর্ন রাজনীতি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শেখ পরিবারের নামে অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের নাম বদল করা হয়েছে। আবার হাসিনা সরকারের পতনের পর ঢালাওভাবে তদারকি সরকার একের পর এক প্রতিষ্ঠানের নাম বদলে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে এই ধরনের পরিবর্তন ঐতিহাসিক স্মৃতি মুছে ফেলে রাজনীতিতে একটা কাউন্টার ন্যারেটিভ বা প্রতিহিংসার রাজনীতিহিসেবেও দেখার সুযোগ রয়েছে। তবে শেখ মুজিবর রহমান হলের নাম বদলের বিষয়টি সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেছেন অনেকে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, ডাকসুর দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে নাম পরিবর্তনের বিষয়টি সিনেটে পাঠানো হয়েছে। সেখানেই চূডা়ন্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।












Discussion about this post