বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। জামায়াত একক বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির দৃশ্যপট বদলে যাওয়ায় সেই বহু চর্চিত প্রশ্ন ঘুরতে শুরু করেছে – আওয়ামী লীগ সুপ্রিমো কি দেশে ফিরতে চলেছেন? তারেক রহমান কি তাঁর ঘরওয়াপসির ব্যবস্থা করছেন? হাসিনা কিন্তু দিল্লিতে থাকাকাকালীন একাধিকবার বলেছেন, তিনি দেশে ফিরতে চান। ফিরতে তিনি বদ্ধপরিকর। সেই সময় বাংলাদেশে তদারকি সরকার। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছে। এই রায় মাথায় নিয়ে তিনি দেশে ফেরেন কি না, সেই প্রশ্নটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে বিএনপি ক্ষমতায় আসায় বাংলাদেশে একটা পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। কিছুদিন আগে তারেক রহমানকে একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন তিনি কোনও রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণার পক্ষপাতি নন। তিনি কিন্তু সুষ্পষ্টভাবে আওয়ামী লীগের কথা বলেননি। যদিও তাঁর এই বার্তা থেকে নানা মহলে গুঞ্জন ওঠে তারেক এবং বিএনপি নেতৃত্ব চাইছে জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে আসুক আওয়ামী লীগ। ভোটের ফল ঘোষণার পর কয়েকটি বিষয় কিন্তু চোখে পড়ার মতো। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বন্ধ থাকা আওয়ামী লীগের দফতর একের পর এক খুলতে শুরু করে। কোনও কোনও প্রান্ত থেকে অবশ্য বাধা দেওয়ার খবর এসেছিল। বাধা এসেছিল প্রশাসনের তরফে। তারেক সরকারের তরফ থেকে প্রশাসনকে এই বার্তা দেওয়া হয় যে কোনও রাজনৈতিকদলের ক্ষেত্রে সরকার দমনপীড়ন নীতি সমর্থন করে না।
যেটা আরও বেশি করে সকলের নজর কেড়ে নিয়েছে, তা হল সংসদে তারেক রহমানের ভাষণ। প্রধানমন্ত্রীকে বলতে শোনা যায়, “শেখ মুজিব কেবল একটি মাত্র দলের নেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন এই ভূখণ্ডের অন্যতম প্রধান সংসদ সদস্য। তিনি ছিলেন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পুরোধা। তারেক বলেন, বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির সূচনায় শেখ মুজিব একজন সংসদ সদস্য হিসেবে যে ভূমিকা পালন করেছিলেন তা ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের উচিত ইতিহাসের সত্যকে সাহসের সঙ্গে স্বীকার করা।” এখানেই শেষ নয়। তারেক জিয়া আরও বলেন, “তারেক আরও বলেন, জাতির পিতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর অবস্থানকে দলীয় সংকীর্ণতার উর্ধ্বে রাখা প্রয়োজন।”
শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে তারেক জিয়ার মুখে বঙ্গবন্ধুর প্রশংসা শুনে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি করেছে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে আদর্শের একটি দেওয়াল ছিল। এই বক্তব্য সেই দেওয়ালে বড় ধরনের ফাটল ধরিয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। বিএনপি শীর্ষনেতৃত্ব থেকে বঙ্গবন্ধুর এমন অবদানের কথা স্মরণ এবং তাঁর অবদানকে স্বীকৃতি সাম্প্রতিক অতীতে কেন, কোনও কালেই হয়নি। বিএনপি স্বীকার করে না মুক্তিযুদ্দে শেখ মুজিবের আত্মত্যাগের কথা। তাদের মতে, মুক্তিযুদ্ধে সব থেকে বেশি অবদান রয়েছে জিয়াউর রহমানের। অনেকে মনে করছেন, তারেক রহমান এখন আর সেই প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে সরে আসতে চাইছেন। তারেকের বক্তব্যকে অনেকে জাতীয় ঐক্য গঠনের একটি প্রয়াস হিসেবে দেখতে চাইছেন। তারা এটিকে মাস্টারস্ট্রোক হিসেবে দেখছেন। সংসদে দাঁড়িয়ে একটি দলের প্রধানমন্ত্রী সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার রাজনৈতিক দলের একজন অবিংসবাদি নেতার প্রশংসা করছেন, সেটা বলা যেতে পারে বিরলের মধ্যে বিরলতম ঘটনা।
এদিকে আবার বেগম জিয়ার মৃত্যুর পর হাসিনা কিন্তু শোক প্রকাশ করেছিলেন। জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে গিয়ে হাসিনা বলেছিলেন, “বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করছি। বাংলাদেশে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তাঁর অবদান অপরিসীম। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে এবং বিএনপি নেতৃত্বের এক অপূরণীয় ক্ষতি হল। ” সেই সময় থেকেই গুঞ্জন তৈরি হয় হাসিনা দেশে ফিরছেন। শুধু সময়ের অপেক্ষা।












Discussion about this post