আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে তদারকি সরকার। আবার সেই নির্দেশিকাকে হাতিয়ার করে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন দলটির প্রতীক ফ্রিজড করে দেয়। ফলে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেনি। বলা ভালো প্রতিদ্বন্দ্বিতার কোনও সুযোগ তাদের সামনে ছিল না। এই অবস্থায় পদ্মাপারে হয়েছে সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছে। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হয়েছে। জামায়াত প্রধান বিরোধীদল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ভোটপ্রচারের সময় জামায়াত ছিল বেশ আত্মপ্রত্যয়ী। নিশ্চিত ছিল তারাই ক্ষমতা দখল করতে চলেছে। তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা করলে জামায়াত সরকার গঠন করত। হয়তো দলের আমির শফিকুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী করা হত। ভোটের আগে বেশ কয়েকটি জনমত সমীক্ষায় ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল যে জামায়াত সরকার গঠন করতে চলেছে। যুক্তি হিসেবে তারা তুলে ধরে আমেরিকার সমর্থন। আমেরিকাও কিন্তু চেয়েছিল জামায়াত ক্ষমতা দখল করুক। কিন্তু দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ জামায়াতকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা ভোট দিয়েছে বিএনপিকে। দলটির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের আরও বড়ো কারণ sympathy vote.
এদিকে ফলাফল ঘোষণার কিছুদিন বাদে আবার জামায়াতের আমির তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুকে পেজে একটি পোস্ট করেন। সেখানে তিনি লেখেন, “আমরা আদর্শ একটি বিরোধীদল হিসেবে আমাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। সরকারের জনকল্যাণমূলক কাজে আমাদের অবশ্যই সমর্থন থাকবে। কিন্তু যেখানে সরকারের থেকে জবাবদিহির প্রয়োজন, সেখানে আমরা সরকারের থেকে অবশ্যই জবাব আদায় করব।” সেই সঙ্গে তাঁর সংযোজন, “আমাদের উদ্দেশ্য সংঘাত নয়, সংশোধন। বাধা দেওয়া নয়, পর্যবেক্ষণ। দেশের মানুষ এমন একটি সংবাদ প্রত্যাশা করে, যা ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকার রক্ষা করবে। এবং স্থিতিশীলতার সঙ্গে রাষ্ট্রকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।”
প্রশ্ন অন্যত্র। বিএনপি কি আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণার পক্ষে? রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, তারেক রহমান কোনওভাবেই এই কলঙ্কের ভাগিধার হতে চাইবেন না। আওয়ামী লীগের নাম শুনতে পারে না প্রধান বিরোধী দল জামায়াত। অসহ্য বোধ করে এনসিপি। এত প্রতিকূলতার পরেও হাসিনা কিন্তু দেশে ফেরার বিষয়ে আত্মপ্রত্যয়ী। এই প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সাম্প্রতিক একটি বক্তব্য তুলে ধরা যেতে পারে। তিনি বলেছিলেন, বিএনপি নীতিগতভাবে কোনও একটি রাজনৈতিকদলকে নিষিদ্ধ ঘোষণার পক্ষপাতি নয়। শেষ এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে জনতা জনার্দন। তারা কিন্তু একটি মোক্ষম সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জামায়াতকে রুখতে বিএনপি আওয়ামী লীগের ভোট প্রার্থনা করেছিল। একই রাস্তা নিয়েছিল জামায়াতও। কিন্তু জামায়াত ক্ষমতায় আসীন হলে বাংলাদেশে তালিবানি শাসন ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তারা আশঙ্কা করেছিলেন। তাই, আওয়ামী লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার বিএনপির শীর্ষনেতাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সেই দলের প্রার্থীদের উজার করে ভোট দিয়েছে। তার ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। এত কিছুর পরেও যে প্রশ্নটা নিয়ে চর্চা থামছে না তা হল আওয়ামী লীগের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা আগের সরকার করে গিয়েছিল, সেই নিষেধাজ্ঞার কী হবে?
শেখ হাসিনা কিন্তু প্রথম থেকে বলে এসেছেন, এই নিষেধাজ্ঞার কোনও আইনি বৈধতা নেই। কারণ, যে সরকার এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ করেছিল, সেই সরকারই অবৈধ। তাই, অবৈধ সরকারের নিষেধাজ্ঞাও অবৈধ। এটা না মানেন তিনি, মানে না দলের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে তৃণমূলস্তরের নেতারা। এতোদিন হাসিনার তরফ থেকে তারেক সরকারকে এই নিষেধাজ্ঞা নিয়ে কোনও বার্তা দেওয়া হয়নি। দেওয়া হল এবার। বিএনপি সরকার প্রধানকে দিল্লি থেকে বসে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন। হাসিনার দাবি মনে তারেক সেই নির্দেশ পালন করেন কি না সেটা দেখার বিষয়।
এই প্রসঙ্গে আরও একটি বিষয় জানিয়ে রাখা দরকার যে তারেকের বিরুদ্ধে লডা়ই করতে জমি তৈরি করছে জামায়াত। তারা বিরোধীদলগুলিকে নিয়ে একটি যৌথ মঞ্চ তৈরি করার চেষ্টা করছে। ফলে, তাদের সেই ক্ষুরধার আক্রমণ প্রতিহত করার শক্তি দিতে পারে আওয়ামী লীগ। তাই, তাদের এবং দলনেত্রীর দেশে ফেরার রাস্তা অবিলম্বে প্রশস্ত করা প্রয়োজন।











Discussion about this post