ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এতদিন কোনও কথা বলেনি। যা নিয়ে বিতর্ক কম হয়নি। নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে শেষ পর্যন্ত মুখ খুললেন বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান। রবিবার ঢাকা সেনানিবাসের সেনাপ্রাঙ্গণে আয়োজিত পৃথক দু’টি সভায় সৈনিকদের সঙ্গে দরবার এবং সেনা কর্মকর্তাদের সাথে অফিসার্স অ্যাড্রেসে সেনাপ্রধান আসন্ন নির্বাচনে বাংলাদেশ সেনার কি ভূমিকা হতে চলেছে সেটা স্পষ্ট করেন। সেনাকর্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন হবে শতভাগ অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ। এতে কোনও দলের পক্ষ নেওয়া যাবে না। এতে কোনও ধরনের স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাত বা রাজনৈতিক আনুগত্য প্রদর্শনের সুযোগ নেই। সেই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সব কর্মকর্তা ও সৈনিককে পেশাদারত্বের সঙ্গে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন।
ঘটনাচক্রে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছে। এই দিক থেকে সেনাপ্রধানের অবস্থান ঠিক উল্টো। যা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে ব্যাপক জল্পনা কল্পনা। বিশ্লেষকদের দাবি, প্রথম থেকেই বাংলাদেশ সেনাপ্রধানের অবস্থান সন্দেহের উর্ধ্বে নয়। তিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে দেওয়া জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে দাবি করেছিলেন এখন থেকে বাংলাদেশের জনগণের জানমালের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে। কিন্তু বিগত দেড় বছরে পদ্মার বুকে অনেক জল গড়ালেও সেনাপ্রধান আদতেও কিছু করেননি। শুধু মাঝেমধ্যে ফোঁস করা ছাড়া। এবারও জেনারেল ওয়াকার আসন্ন নির্বাচন নিয়ে যা বললেন, তা আদৌ সেনাবাহিনী পালন করবে কিনা সেটা নিয়েও অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করছেন। কারণ, ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে একের পর এক হিন্দুর হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। অনেক জায়গায় বিএনপি-সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা আক্রান্ত হচ্ছেন। বাংলাদেশে বেআইনি অস্ত্র উদ্ধার এবং সন্ত্রাসীদের ধরতে গিয়ে খুন হলেন খোদ র্যাবের কর্মকর্তাই। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কোনও হেলদোল নেই।
তবে রবিবার সেনাপ্রধান যা বলেছেন, তাতে কিছুটা হলেও গুরুত্ব রয়েছে। যেমন তিনি বলেছেন, নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এমন জায়গায় নিতে হবে, যাতে সব শ্রেণির মানুষ ভোটকেন্দ্রে যান। ভোটকেন্দ্র বা মাঠের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে সবাই নির্বিঘ্নে-নিশ্চিন্তে ভোট দিয়ে ঘরে ফিরতে পারেন। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। এটাই তো বাংলাদেশের জনগণের চাহিদা। এরজন্য তিনি নির্বাচন ঘিরে ‘নিরাপত্তা বলয়’ গড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্র জানিয়েছে সেনাপ্রধান উপস্থিত সেনাকর্তাদের বলেছেন, সেনাবাহিনী কোনো রাজনৈতিক পক্ষের নয়। আমরা রাষ্ট্রের, সংবিধানের ও জনগণের পক্ষে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, যে কাজ প্রথম থেকেই করার কথা ছিল সেনাপ্রধানের, সেটা এখন করার কথা বলছেন। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে জায়গায় দাঁড়িয়ে, তাতে সেনাবাহিনী কতটা সফল হবে, সেটা নিয়েই সন্দেহ রয়েছে। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে মানবাধিকার লঙ্ঘনের একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর যে ধরণের আক্রমণ চলছে, ক্রমাগত খুনের ঘটনা সামনে আসছে তাতে কার্যত মুখ পুড়ছে বাংলাদেশের। এমনকি সম্প্রতি সেনা হেফাজতে এক বিএনপি কর্মীর মৃত্যুর ঘটনাও সামনে এসেছে। এই আবহে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার বলেছেন, সেনা হেফাজতে যেন কোনোভাবেই মৃত্যুর ঘটনা বা মানবাধিকার লঙ্ঘন না ঘটে, সে বিষয়ে শতভাগ সতর্ক থাকতে হবে। কোনো অপরাধীকে গ্রেফতারের পর দ্রুত পুলিশের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। সবমিলিয়ে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকারের বক্তব্য সামনে আসার পর ওয়াকিবহাল মহলের প্রতিক্রিয়া, আবার শীতঘুম ভেঙেছে জেনারেল ওয়াকারের।












Discussion about this post