মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের মাঝেই কুটনীতির রাস্তা তৈরি করেছে ভারত। ইরানের সঙ্গে তারা বন্ধুত্ব করেছে। ইজরায়েলের সঙ্গে তারা জোট করেছে। আর আমেরিকার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক হিসেবের। যুদ্ধের ফল কোনওকালেই শুভ ছিল না। যুদ্ধ ধ্বংস ডেকে আনে। যুদ্ধে মানুষের প্রাণ যায়। শুরু হয় মৃত্যু মিছিল। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, যে দেশ যুদ্ধের কেন্দ্রে থাকে, সেই দেশের সব চেয়ে বেশি ক্ষতি হয়। যুদ্ধে না থেকেও যুদ্ধ থেকে কোনও কোনও দেশ সুযোগ বের করে নেয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মধ্যে সেই ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে ভারতকে।
কী সুযোগ, তা নিয়ে এবার আলোচনা করা যাক। দিনটি ছিল ৮ মার্চ। বিশ্বের সব চেয়ে বিপজ্জনক জলপথে প্রবেশ করল একটি জাহাজ। যে সময় জাহাজটি জলপথে প্রবেশ করে, সেই সময় চারিদিক থেকে শুরু হয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। হরমুজ প্রণালী কার্যত সামরিক নিয়ন্ত্রণে। হঠাৎ এই সময়ে সব রেডার থেকে আশ্চর্যজনকভাবে অদৃশ্য হয়ে যায় সেই জাহাজটি। এই ঘটনা নিয়ে তৈরি হয়েছে কৌতুহল। এটি কোনও দুর্ঘটনা নয়। বলা হচ্ছে, এটা একটি প্রযুক্তির ক্যারিশমা। বরং এটি ছিল পরিকল্পনা। জাহাজটির নাম ছিল “শেনলং সুয়েজম্যাক্স”। যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথম কোনও তৈলবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালী হয়ে ভারতে পৌঁছল। এর মধ্যে রয়েছে ১ লক্ষ ৩৫ হাজার মেট্রিকটনের বেশি তেল।
“লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজ্যান্স” এবং “ট্যাঙ্কার ট্যাকার্সের” তথ্য অনুযায়ী জাহাজটি গত ৩ মার্চ সৌদি আরবের রাস তনুরা বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে। ৮ মার্চ জাহাজটি ছিল হরমুজ প্রণালীতে। সেই সময় জাহাজটির সঙ্গে সব রকম যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মনে করা হচ্ছে, সম্ভাব্য ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এড়াতে “শেনলং সুয়েজম্যাক্স” নিজের অবস্থান লুকিয়ে ফেলে। পরের দিন ৯ মার্চ সেটিকে আবার দেখতে পাওয়া যায়। মুম্বই বন্দরের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, বুধ সন্ধ্যায় জাহাজটি নোঙর করে। তার পরেই ভিতরে থাকা অশোধিত তেল বাইরে বের করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তেল চলে যাবে পূর্ব মুম্বইয়ের মহুল শোধনাগারে। জাহাজটির মালিক এথেন্সের একটি সংস্থা। জাহাজটি ভারত, পাকিস্তান এবং ফিলিপিন্সের মোট ২৯ জন কর্মী রয়েছেন। যদি কেন্দ্রীয় জাহাজ মন্ত্রক থেকে এই বিষয়ে কোনও বিবৃতি দেওয়া হয়নি। তবে পরিস্থিতি এখনও কিন্তু স্বস্তিদায়ক নয়। হরমুজ প্রণালীতে এখনও আটকে রয়েছে ২৮টি পণ্যবাহী জাহাজ। আরব দুনিয়ার এই যুদ্ধ ভারতের বাজারে পড়তে শুরু করেছে। ২৮টি জাহাজ কবে দেশে ফিরবে, সে বিষয়ে কোনও প্রান্ত থেকে কিছু জানা যাচ্ছে না। বিশেষ সূত্রে পাওয়া খবরে জানা গিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে বিস্ফোরক মাইন পাতা শুরু করেছে ইরান। এমনই আশঙ্কা প্রকাশ করেছে একাধিক গোয়েন্দা সূত্র।
এদিকে আবার হরমুজ প্রণালী দিয়ে যুদ্ধ জাহাজ ভারতে আসা নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। কোনও কোনও প্রান্ত থেকে বলা হচ্ছে ভারতে তেলবাহী জাহাজকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রবেশের ক্ষেত্রে ইরানের সঙ্গে ডিল হয়েছে। দাবি উড়িয়ে দিয়েছেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্কর। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ফিনান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিদেশমন্ত্রী বলেন, “এটা দেনা-পাওনার বিষয় নয়। ইরানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ। আমাদের একে অপরের সঙ্গে বোঝাপড়া রয়েছে। তার ভিত্তিতে আমি ইরানের সঙ্গে কথা বলেছি। ” সাক্ষাৎকারে জয়শঙ্কর বলেন, “আমি ওদের সঙ্গে কথা বলেছি। সেই কথাবার্তার ফল কিছু পাওয়া গিয়েছে। এই প্রক্রিয়া এখনও অব্যাহত রয়েছে। এটা ফলদায়ক হলে আমরা তেহরানের সঙ্গে এই আলোচনা চালিয়ে যাব। ”
ইরান এবং ওমানের মাঝখানে থাকা হরমজু প্রণালী পৃথিবীর সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোরের অন্যতম। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। বর্তমানে এই পথ বন্ধ থাকায় প্রতিদিন প্রায় ১৫ মিলিয়ন ব্যারেল অশোধিত তেল এবং ৪.৫ মিলিয়ন ব্যারেল পরিশোধিত তেল পারস্য উপসাগরে আটকে রয়েছে।












Discussion about this post