ডঃ মুহাম্মদ ইউনূস গত বছরের আগস্ট মাসের শুরুর দিকে সুদূর ফ্রান্স থেকে বাংলাদেশে আসেন একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দিতে। তার আগে বাংলাদেশে ঘটে গিয়েছে রাজনৈতিক পালাবদল। জুন-জুলাইয়ের বিপ্লব থেকে শুরু করে ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান। সবমিলিয়ে বাংলাদেশে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার পতন এবং ডঃ ইউনূসের উত্থান। কিন্তু অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ কি পেল? একজন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদের হাতে বাংলাদেশের আর্থিক হাল কতটা ফিরল? দেশের আইন-শৃঙ্খলা কতটা ফিরল? কতটা স্বাভাবিক হল দেশ? বাংলাদেশের আম জনতার মনে এখন এই প্রশ্নগুলিই ঘুরপাক খাচ্ছে। এমনকি কোনও কোনও অংশ থেকে এই দাবিও উঠতে শুরু করেছে ডঃ ইউনূসের এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারটাই অবৈধ। সমাজের একটা বড় অংশের মানুষ বলতে শুরু করেছেন, আগের হাসিনা জমানাই ভালো ছিল। সেই সরকারের পরিবর্তন করে আমরা ভুল করেছি। যা বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য সিঁদুরে মেঘ বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক মহলের একাংশ। এটা যে তাঁদের ক্ষমতায় থাকার অন্তরায়, সেটা হাড়ে হাড়ে বুঝেছেন ইউনূসবাহিনী। তাই বিচারের নামে প্রহসন শুরু হয়েছে বাংলাদেশে। শেখ হাসিনাকে গণহত্যার দায়ে ফাঁসি-কাঠে ঝোলাতে চায় ইউনূসের সরকার। কিন্তু হাসিনাকে তাঁরা পাবেন কোথা থেকে? কারণ শেখ হাসিনা তো এখন বহাল তবিয়তে দিল্লিতে অবস্থান করছেন। আর নয়া দিল্লি যে তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে এমন সম্ভাবনাও নেই বললেই চলে। তাহলে কিসের বিচার?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলের অভিমত, আওয়ামী লীগকে এত সহজে দমানো যাবে না। কারণ, আওয়ামী লীগ শুধু বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দলই নয়, সে দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেও তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। মুহাম্মদ ইউনূস সরকার যতই আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করুক না কেন, মানুষের মন থেকে এত সহজে মুছে ফেলতে পারবে না। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচার শুরু হয়েছে ঢাকার আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালে। তাঁর বিরুদ্ধে মূলত অভিযোগ, জুলাই-অগস্টের গণআন্দোলনে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’। তবে শুধু হাসিনা নন, একই অপরাধে বাংলাদেশের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এবং পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধেও জারি হয়েছে পরোয়ানা। যদিও চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন ইতিমধ্যেই জেলবন্দি, বাকিরা পলাতক। আাগমী ১৬ জুন তিনজনকেই আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশিকা জারি হয়েছে। আইনজ্ঞরা বলছেন, শেখ হাসিনা ও প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে ছাড়াই এই বিচার প্রক্রিয়া চলবে। এমনকি সাজাও ঘোষণা হতে পারে। ফলে সবটাই প্রহসন। কারণ, ভারত শেখ হাসিনাকে ঢাকার হাতে তুলে দেবে না। কেউ কেউ বলছেন, হাসিনার ভাগ্য দিল্লিই ঠিক করবে।
এই মুহূর্তে শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী নেতাদের পাশে একমাত্র ভারতই আছে। ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলিও এখন আওয়ামী লীগের পাশে নেই। এর কারণ হল, মুহাম্মদ ইউনূস ও বর্তমান সরকারের তরফে ক্রমাগত আওয়ামী লীগের পাশে যে হত্যাকারী তকমা লাগিয়ে চলেছে তাতে অনেকটাই পশ্চিমা দেশগুলি বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। এখন আওয়ামী লীগের প্রয়োজন, ইউরোপ ও আমেরিকায় তাঁদের শাখা সংগঠনগুলিকে আরও সক্রিয় করে তোলা। যাতে ইউনূসের বিরুদ্ধে পাল্টা প্রচার করে নতুন করে আওয়ামী লীগের পালে হাওয়া টেনে আনা যায়। আওয়ামী লীগের জন্য একটাই আশার আলো নয়া দিল্লির ছত্রছায়া। ভারতের প্রায় সবকটি রাজনৈতিক দল, বিজেপি, কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সম্পর্ক খুব ভালো। ফলে হাসিনার গায়ে আঁচও কাটতে পারবে না বাংলাদেশ। আওয়ামী লীগ যতদিন বাংলাদেশের ক্ষমতায় ছিল, নয়া দিল্লিও নিশ্চিন্ত ছিল। হাসিনা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ, তাই সে দেশে সংখ্যালঘু হিন্দুরাও নিরাপদে ছিল। ইউনূসের আমলে হিন্দুরা অত্যাচারিত হচ্ছে। পাশাপাশি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শেখ হাসিনা বরাবরই দিল্লির লাইন মেনে চলছিলেন। তাঁর আমলে বহু জঙ্গি নেতাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। ক্ষমতায় এসেই যাদের ছেড়ে দিয়েছে ইউনূসের তদারকি সরকার। এটাও হাসিনার পক্ষে যাচ্ছে। ফলে দিল্লি চাইছে, হাসিনাকেই ফের ক্ষমতায় নিয়ে আসতে। যদিও এই কাজটা সহজ নয়। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যাচ্ছে নেত্রীর অনড় মনোভাব। আওয়ামী লীগের বহু দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা-নেত্রীদের তিনি আড়াল করার চেষ্টা করে চলেছেন। যাদের বিরুদ্ধে ভূড়ি ভূড়ি দুর্নীতির অভিযোগ, তাঁদের দল থেকে বহিস্কার করে যদি তিনি নতুন রণনীতি ঘোষণা করতেন, তাহলে বাংলাদেশের মানুষের মনে ফের সহানুভূতির হাওয়া আসতো বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
কিন্তু বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা, বা জঙ্গি তকমা দিয়ে ছাত্র লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা হাসিনার পক্ষেই যাচ্ছে। আবার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলার যে উদ্যোগ ইউনূস সরকার নিয়েছে। একের পর এক অধ্যাদেশ জারি করে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধকেই হেয় করার অপচেষ্টা চলছে। এমনকি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকেই মুক্তিযোদ্ধার সম্মান ছিনিয়ে নেওয়ার যে আদেশ জারি হয়েছে সেটাও মেনে নিতে পারছেন না অধিকাংশ সাধারণ মানুষ। এই মুহূর্তে যদি শেখ হাসিনা বাংলাদেশের অভ্যন্তরেই ফের পরিবর্তনের ডাক দিয়ে নতুন করে ঝাঁপায়, তাহলে তিনি সফল হবেন বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহলের একাংশ।












Discussion about this post