আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে ড্রোন উৎপাদনের যুগে প্রবেশ করছে বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে চিনের সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) একটি সামরিক ড্রোন উৎপাদন কারখানা স্থাপনে চুক্তি করবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ বিমানবাহিনী এবং চিনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সিইটিসি ইন্টারন্যাশনালের মধ্যে এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হবে। এতে বাংলাদেশ একদিকে যেমন আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষাব্যবস্থার পথে একধাপ এগিয়ে যাবে, অন্যদিকে ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও এটি হবে অনন্য পদক্ষেপ।
গত ৬ জানুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয় “এস্টাবলিশমেন্ট অব ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট এন্ড ট্রান্সফার অব টেকনোলজি (টিওটি) ফর আনম্যানড এরিয়াল ভ্যাহিকেল (ইউএভি)” শীর্ষক প্রকল্প প্রস্তাবের অনুমোদন দেয়। ৬০৮ কোটি আট লাখ টাকার এই প্রকল্পে ড্রোন ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট, প্রযুক্তি আমদানি ও স্থাপনের জন্য এলসি খোলা এবং পরিশোধ বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫৭০ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মাহমুদ হোসেন জানান, বাংলাদেশ আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে ড্রোন উৎপাদন কারখানা স্থাপনে আগে থেকেই আগ্রহ দেখিয়ে আসছে। এতে প্রতিবেশী দেশগুলোর কিছুটা উদ্বেগ থাকলেও জাতীয় স্বার্থে এই পদক্ষেপ প্রশংসনীয়। আবার চিনের সহায়তায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হওয়ায় পশ্চিমের একটি অংশের উদ্বেগ থাকলেও জাতীয় স্বার্থে এটা উপেক্ষা করতে হচ্ছে। বাংলাদেশের সমুদ্র প্রতিরক্ষা, সীমান্ত অপরাধ নজরদারিসহ নানা কাজে ড্রোন ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে বাইরের এসব উদ্বেগ নিরসনে কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে বাংলাদেশের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তাদের বোঝানো যায়। তিনি বলেন, বাংলাদেশ আগে থেকেই ড্রোন তৈরির কথা চিন্তা করছে। কিন্তু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অভাবে বেশি দূর এগোনো যায়নি। তিনি আরও বলেন, ড্রোন শুধু সামরিক খাতে নয়, এটি বেসরকারি খাতেও ব্যবহার করা যায়। অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ এই নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে অস্বীকার করেন। ড্রোন কারখানা স্থাপন ও প্রযুক্তি হস্তান্তর (টিওটি) আমদানির প্রস্তাব অনুমোদনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “কোন দেশ থেকে যুদ্ধবিমান কেনা হবে—এ নিয়ে অনেক আলোচনা চলছে। তাই এখনই ড্রোন বা যুদ্ধবিমান নিয়ে কিছু বলছি না। সবকিছু আগে চূড়ান্ত হোক।”
প্রস্তাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী চিনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা ইলেকট্রনিক্স প্রতিষ্ঠান ‘চায়না ইলেকট্রনিক্স টেকনোলজি গ্রুপ করপোরেশন (সিইটিসি) ইন্টারন্যাশনাল’-য়ের সরবরাহকৃত প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী দেশেই ড্রোন উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা অর্জন করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমাতে সহায়ক হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন। এ বিষয়ে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতরের কর্মকর্তারা কোনও মন্তব্য করতে অস্বীকার করেন।
পাঁচটি শর্তে অর্থ মন্ত্রক প্রস্তাবটি অনুমোদন করে। এর মধ্যে রয়েছে চলতি অর্থবর্ষের জন্য যে অর্থ ব্যয় করতে হবে, তা প্রদত্ত বরাদ্দের মধ্যে থেকেই। এর জন্য বাড়তি কোনও অর্থ বরাদ্দ করা হবে না। চিনের রাষ্ট্রায়ত্ত সিইটিসি ইন্টারন্যাশনাল শুরুতে জাহাজ ভা়ড়াসহ সব মিলিয়ে ৬৪৩. ৬১ কোটি টাকা বরাদ্দ করে। তবে বিমানবাহিনীর কর্মকর্তারা গত নভেম্বরে চিনা সংস্থাটির প্রতিনিধির সঙ্গে আলোচনা করে চুক্তিমূল্য ৩৫.৫৩ কোটি টাকা কমিয়ে ৬০৮.০৭ কোটি টাকায় নামিয়ে আনেন। সিইটিসি ইন্ট্যারন্যাশনাল ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ইলেক্ট্রনিক তথ্যপ্রযুক্তির সব খাতজুড়ে কার্যক্রম থাকা চিনের একমাত্র বৃহৎ প্রযুক্তি কর্পোরেশন এটি যার আওতায় রয়েছে প্রতিরক্ষা ইলেক্ট্রনিক্স, নিরাপত্তা ইলেক্ট্রনিক্স ও ইনফরমাইজেশন। প্রতিষ্ঠানটির পণ্য ও সেবা বর্তমানে বিশ্বের ১১০টির বেশি দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এই ড্রোন উৎপাদন কারখানা ও টিওটি আমদানিতে যে অর্থ ব্যয় হবে সে জন্য বিমানবাহিনীকে বাজেটে বাড়তি অর্থ বরাদ্দ করার প্রয়োজন হবে না। বাহিনীর জন্য প্রতিবছর বাজেটে “অন্যান্য যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম ”খাতে যে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা দিয়েই এই ব্যয় সামাল দেওয়া যাবে।
আমেরিকা কিন্তু বিষয়টিকে রীতিমতো গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। ঢাকায় পা রেখে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন জানিয়েছেন, চিনের সঙ্গে সামরিক ও নিরাপত্তা ইস্যুতে সম্পর্ক রাখার ক্ষেত্রে ঝুঁকি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এই বিষয়ে উদ্বিগ্ন। এটা কোনও সাধারণ বক্তব্য নেই। বক্তব্যের লক্ষ্য সরাসরি ইউনূস সরকার। মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান খুব স্পষ্ট। আমেরিকা চায় না সামরিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ চিনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ুক। গত দুই বছর ধরে আমেরিকা চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছে। এমনকী জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান আমেরিকার সফরকালে তাকে এই বিষয়ে অবগত করা হয়। পরামর্শ দেওয়া হয় এই প্রকল্প থেকে সরে আসার। এদিকে, বাংলাদেশে চিনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন প্রকল্পের অগ্রগতির জন্য তদারকি সরকারকে ধন্যবাদ জানান। ইউনূস পড়েছেন উভয়সংকটে। একদিকে চিন অপর দিনে আমেরিকা।
গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর অন্তবর্তী সরকার ক্ষমতায় আসে। মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সরকার গঠন হয়।...
Read more












Discussion about this post