বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের পর থেকে সে দেশের মানুষ বহুবার সেনা অভ্যুত্থানের সাক্ষী থেকেছেন। ব্যাপারটা যেন তাঁদের গা সওয়া হয়ে গিয়েছে। এবারও এক সেনা অভ্যুত্থানের গুঞ্জন ক্রমশ বড় হচ্ছে বাংলাদেশজুড়ে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, আরেকটা সেনা অভ্যুত্থান বাংলাদেশে সংগঠিত হলেও হয়ে যেতে পারে। অভ্যুত্থান এবং পাল্টা অভ্যুত্থানের কারণে দীর্ঘ সময়ের জন্য বাংলাদেশ নিমজ্জিত ছিল সামরিক শাসনের মধ্যে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছরের মধ্যে ১৮ বছরই কেটেছে প্রত্যক্ষ সামরিক শাসন এবং সেনাবাহিনীর প্রভাবে। এই সেনা অভ্যুত্থানের মধ্যে পাঁচটি ঘটনা সবচেয়ে সুদুরপ্রসারী বলেই মনে করেন সে দেশের বিশ্লেষকরা। উল্লেখ্য, ১৯৭৫ সালের আগস্টে প্রথম অভ্যুত্থান থেকে ২০১১ সালের ডিসেম্বরে সর্বশেষ প্রচেষ্টা পর্যন্ত, বাংলাদেশ মোট ২৯টি সামরিক অভ্যুত্থানের সাক্ষী হয়েছে। যা ওই দেশের বহু উত্থান-পতন এবং ক্ষমতার পরিবর্তনের সাক্ষী থেকেছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় অর্থাৎ ১৯৭৫ সালে এক ভয়াবহ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্ট বিয়োগান্ত ঘটনাটি ঘটিয়েছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একদল অফিসার। যা বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ সম্পূর্ণ উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিল। বাংলাদেশের কয়েকজন জুনিয়ার সামরিক অফিসাররা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান-সহ তাঁর পরিবারের ৯ জন সদস্যকে হত্যা করেন সেই রাতে। ওই অভ্যুত্থআনের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জায়গায় খন্দকার মোশতাক আহমেদকে ক্ষমতায় বসানো হয়। অভ্যুত্থানকারীরা আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলেন পাকিস্তানপন্ধী এই আওয়ামী নেতাকেই রাষ্ট্রপতি করা হবে। কিন্তু ক্ষমতার লাগাম তাঁরা নিজেদের হাতেই রেখেছিলেন। ওই বছরের ৩ নভেম্বর, বাংলাদেশে ঘটে যায় আরও এক সামরিক অভ্যুত্থান। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদকে ক্ষমতা থেকে অপসারণের জন্য একটি অভ্যুত্থান সংগঠিত করেন। উল্লেখ্য, মুজিব হত্যার পর জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান হওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন মেজর জেনারেল খালেদ মোশারফ। দ্বিতীয় অভ্যুত্থআনে শুরুতেই বন্দি করা হয় সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে। সেই রাতেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আট থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের চার সিনিয়র নেতা – সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী এবং এএইচএম কামরুজ্জামানকে গুলি করে হত্যা করা হয়। যদিও খালেদ মোশারফের নেতৃত্বে এই অভ্যুত্থান ছিল ক্ষণস্থায়ী। এটি টিকে ছিল মাত্র চারদিন।
এর পরের উল্লেখযোগ্য অভ্যুত্থান সংগঠিত হয় ১৯৮১ সালের ৩০ মে। সেবার জিয়াউর রহমানকে চট্টগ্রামে সেনা কর্মকর্তারা হত্যা করেন। এর পরের সেনা অভ্যুত্থান ঘটেছিল ঠিক এক বছর পর। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ। বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারের সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেন তৎকালীন সেনা প্রধান ল্যাফটেনেন্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এ সময় তিনি সামরিক আইন বা মার্শাল ল জারি করেন এবং নিজেকে দেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ঘোষণা করেন। তারপর বাংলাদেশে আরও কয়েকটি সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর সংগঠিত হয় ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিখ্যাত বা কুখ্যাত ওয়ান-ইলেভেন নামে। বাংলাদেশে সে সময় চলছিল ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকট ও সংঘাত। ২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে সেনাবাহিনী। স্থগিত করা হয় বিএনপির সরকারের আয়োজন করা নির্বাচন। লেফটেন্যান্ট জেনারেল মঈন উ. আহমেদ এক অভিনব সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সরাসরি ক্ষমতা দখল না করেও তাদের পছন্দসই বেসামরিক ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে। এরপর দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর দুই বছর পর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আবারও ক্ষমতায় ফিরে আসে।
২০২৪ সালের ঘটনাবলিও অনেকটা ওয়ান-ইলেভেনের মতোই। তবে এবার সেনাবাহিনী বা সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান সরাসরি অভ্যুত্থানে অংশ নেয়নি। বরং পিছন থেকে ছাত্র-জনতাকে সমর্থন করেছিল। এবারও এক অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেছে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে। ১৫ মাস হয়ে যাওয়ার পরও এই সরকার নির্বাচন দেয়নি। তবে বলেছেন আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে। সেটাও কিন্তু অনিশ্চিত। এরমধ্যেই ১৫ জন সামরিক কর্তা ও ১০ জন সদ্য অবসর নেওয়া সেনাকর্তার বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেফতারি পরোয়ানা ঘিরে ফের উত্তেজনা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অন্দরে। একটা বিদ্রোহের চাপা আগুন জ্বলছে। আর তা জ্বলছে সেনাপ্রধান ওয়াকারের ভূমিকা নিয়ে। ফলে বাংলাদেশে আরও একটা সেনা অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েই আছে। এখন দেখার সেটা হয়, নাকি অচিরেই সমস্যার সমাধান হয়।












Discussion about this post