বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের নির্বাচনে দলের জয় নিশ্চিন্ত হতেই ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আশা প্রকাশ করেছিলেন, সাবেক স্বৈরাচার শেখ হাসিনাকে ভারত বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেবে। তাঁর মন্তব্য ছিল, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনেই এই প্রত্যর্পণ সম্পন্ন হবে বলে তাঁর দল বিশ্বাস করে। কিন্তু নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের আগে সেই তিনিই কার্যত ১৮০ ডিগ্রি পাল্টি খেয়ে জানিয়ে দিলেন, ভারত-বাংলাদেশ সুসম্পর্কের পথে শেখ হাসিনা ইস্যু কোনওভাবেই বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। বাংলাদেশে নয়া সরকারের শপথগ্রহণের আগে এমনই বার্তা দিলএকইসঙ্গে ভারত বিদ্বেষের যে চারাগাছ রোপন করে গিয়েছেন মহম্মদ ইউনুস তা কার্যত উপড়ে ফেলার ইঙ্গিত দিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল। তাঁর নতুন বার্তা, “যারা ভারতের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা বলছেন তাঁরা আসলে পাগলের প্রলাপ বকছেন। আরেক ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য হিন্দু’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ দাবি করেছেন। তাহলে বিষয়টি গিয়ে দাঁড়াল মির্জা ফখরুল প্রথমে যা বলেছিলেন সেটা বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান মান্যতা দেয়নি। পরে তাই তিনি নিজের কথাই পাল্টে দিয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এটাই আসলে বর্তমান বিএনপি সরকারর মনোভাব। ভারতের সঙ্গে আর সংঘাতে যাবে না দলটি।
মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়ার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তাঁকে মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ানো হয়েছে মঙ্গলবার। এর অর্থ তাঁকে রাষ্ট্রপতি করা হচ্ছে না। কিন্তু তিনি তারেক রহমান মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, বিরোধী দলে থাকা আর সরকার পক্ষে মন্ত্রী হওয়া দুটি ভিন্ন অবস্থান। সেই দিক থেকে মির্জা ফখরুলের দাবি পাল্টে যাওয়া নতুন কোনও ইঙ্গিত নয়। তিনি দ্য হিন্দুকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, কিছু ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সমস্যা রয়েছে, কিন্তু সেই বিষয়গুলি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজা হবে। বিএনপি মহাসচিব স্পষ্ট ইঙ্গিত করেছেন, গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তি এবং ফারাক্কা বাঁধের প্রসঙ্গ। শেখ হাসিনা ইস্যু নিয়ে তাঁর নতুন বক্তব্য হল, “আমরা মনে করি হাসিনা মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছেন। দেশের জনগণ তাঁর শাস্তি চান। আমরাও মনে করি হাসিনাকে আমাদের হাতে তুলে দেওয়া উচিত ভারতের। কিন্তু শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর না-করার বিষয়টি বাণিজ্য-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৃহত্তর সম্পর্ক গড়ে তোলার পথে কোনও বাধা হবে না। আমরা আরও ভাল সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাই”।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তি এই মুহূর্তে বাংলাদেশের গলার কাঁটা। চলতি বছরেই এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। ফলে এই চুক্তি নবীকরণ করতেই হবে বাংলাদেশকে। ভারত যেভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে সিন্ধু জলবন্টন চুক্তি বাতিল করেছে এবং পাকিস্তানও সেটা নিয়ে তেমন কিছু প্রতিবাদ জানাতে পারছে না। সেটা মাথায় রাখতে হচ্ছে তারেক রহমানদের। তাই বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল সুর নামিয়ে জানিয়েছেন, ভারতের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চায় বাংলাদেশ। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী এলাকার সমস্যা নিয়েও ভারতের সঙ্গে আলোচনা করতে চায় সে দেশের নতুন সরকার। ফখরুলের দাবি, আমরা ভারতের সঙ্গে লড়াই করতে পারব না। আমাদের কথা বলতে হবে। যাঁরা ভারতের সঙ্গে লড়াই করার কথা বলেন, তাঁরা পাগলের মতো কথা বলছেন।
তবে এই ইস্যুকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে বিএনপির এদিনের সিদ্ধান্ত। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়া বিএনপির নির্বাচিতরা সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রীরা মঙ্গলবার শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। জানা গিয়েছে এদিন অনুষ্ঠানে শপথের জন্য নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দুটি ফর্ম দেওয়া হয়েছিল। একটি ছিল সাদা রঙের, যেটি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার ফর্ম। অন্যটি ছিল নীল রঙের, যেটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার ফর্ম। কিন্তু শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের আগেই বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়ে দেন, তাঁরা সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হননি। তিনি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই নির্দেশনা দিচ্ছেন বলে সহকর্মীদের জানান। ফলে বিএনপি সাংসদরা আর নীল ফর্ম পুরণ করেননি এবং গণপরিষদের সদস্য হিসেবে শপথও নেননি। পরিস্থিতি যে দিকে যাচ্ছে, তাতে ইউনূস ও তাঁর দোসরদের গত দেড় বছরের চেষ্টায় জল ঢেলে দিতে চলেছে বিএনপি। কিন্তু একটাই বিএনপি আবার একটি কাজ করেছে, সেটা হল বিগত ইউনূস সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা খলিলুর রহমানকে মন্ত্রিসভায় ঠাঁই দিয়েছে। হয়তো তাঁকেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা হবে। এটা কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নাকি ভারতকে খুশি করতে করল বিএনপি?












Discussion about this post