বাংলাদেশের ত্রয়োদশ নির্বাচন শেষ, এমনকি ফলাফল ঘোষণা হয়ে গিয়েছে। মঙ্গলবার বিএনপি সরকার গঠন করে ফেলেছে, প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন খালেদাপুত্র তারেক রহমান জিয়া। বিএনপি ক্ষমতায় আশায় ভারত সরকার যতটা না সুবিধা পেল তার থেকে বেশি আশঙ্কায় রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত লালুয়া এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর আসন পাওয়া নিয়ে। এটা ভারতের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটা বড় হুমকি হতে পারে বলেই মনে করছে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলি। যদিও এই ভারত সীমান্তবর্তী এলাকায় জামাতের আসল বৃদ্ধি আগে থেকেই পরিকল্পিত ছিল। কুখ্যাত পাক জঙ্গি গোষ্ঠী জৈস এ মহাম্মদ বা লস্কর এ তৈবা বাংলাদেশের পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত লাগোয়া এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেছিল জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে। ধর্ম প্রচারের নামে একাধিকবার যতগুলি শীর্ষ জঙ্গি নেতা বাংলাদেশের রাজশাহী, খুলনা বা রংপুর ডিভিশনে কয়েক মাস ধরে অবস্থান করেছিল। এটা ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলির নজর এড়ায়নি।
দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনগুলির মধ্যে একটি বাংলাদেশে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে, বাংলাদেশ মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দ্বারা শাসিত হয়ে আসছিল। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি এবারের নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে বাংলাদেশের ক্ষমতায় বসেছে। তবে ভারতের জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জামায়াতে ইসলামীর উত্থান। আপাত দৃষ্টিতে অনেকেই মনে করছিলেন, ভারত চাইছিল জামায়াত যাতে কোনওভাবেই নির্বাচনে না জেতে। কিন্তু বিএনপি বাংলাদেশের ত্রয়োদশ নির্বাচনে জিতলেও মোটে স্বস্তি পাচ্ছে না ভারত। কারণ জামায়াত একক ক্ষমতায় ৭৭টি আসন জিতেছে এই নির্বাচনে। তবে সহযোগী দলগুলিকে নিয়ে জামাতের এগারো জোটের আসন সংখ্যা ৭৭। এরমধ্যে ছাত্রদের নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি জিতেছে ৬টি আসন। আপনারা ভাবতেই পারেন জামাতের এই উত্থানে কেন ভারতের মাথাব্যাথ্যা শুরু হয়েছে। এই ভাবনার পিছনে রয়েছে একটা কারণ। দাবি করা হচ্ছে, বিএনপিই ছিল নরেন্দ্র মোদি সরকারের কাছে মন্দের ভালো, তাঁরাই বাংলাদেশের ক্ষমতায় এসেছে। তবুও কেন চিন্তা বাড়ল নয়া দিল্লির। আসল কারণটা লুকিয়ে আছে জামাতের জয়ের মানচিত্রে। সে দিকে এক ঝলক তাকালেই দেখা যাচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমে সাতক্ষীরা ৪ আসন থেকে শুরু করে উত্তর দিকে এগোলে মেহেরপুর-২ আসন পর্যন্ত ভারত-বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সীমান্ত বরাবর নিরবচ্ছিন্নভাবে জিতেছে জামায়াতে ইসলামী এবং তাঁদের সহযোগী দলগুলি। আবার সীমান্ত থেকে কিছুটা অভ্যন্তরে খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া আর পাবনার অনেক আসনও জামায়াতের জোটের দখলে গেছে। মোটের ওপর, জামায়াতে ইসলামীর জোট যে-সব এলাকায় জিতেছে, সেগুলি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ আর কিছুটা আসামের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মধ্যেই পড়ে। ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশে জামায়াতের এই ফলাফল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষত এক-দুই মাসের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন হতে চলেছে। যদি্ও ভোটে হারার পর জামায়াতের সুর পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। জামাতের আমির সফিকুর রহমান সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মুখ খুলেছেন। তাঁর দাবি, আমরা সরকার ও বিরোধীপক্ষ যদি মিলেমিশে প্রকৃত গণতান্ত্রিক আচরণ করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশের উন্নতি হতে বাধ্য।
পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দল তথা দিল্লির শাসকদল বিজেপি জামায়াতে ইসলামীর বিজয়কে কীভাবে দেখছে? পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি তথা কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার যেমন দাবি করেছেন, উদ্বিগ্ন হওয়ার মতই বিষয়, সীমান্তের দু’পারেই জামাতের সংখ্যা বাড়ছে, ওপারে আসল জামাত আর এপারে তৃমূলের বোরখা পরা জামাত। তিনি আসলে এপার বাংলার সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে সাম্প্রতিক হিংসার ঘটনাই বোঝাতে চেয়েছেন।
বাংলাদেশের নির্বাচনে যে হারে সীমান্তবর্তী এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর প্রভাব বাড়ছে তাতে চিন্তায় রয়েছে নয়া দিল্লি। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এতদিন বাংলাদেশে জামাতের নিয়ন্ত্রণাধিন মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার ছিল। সেই সুযোগে পাকপন্থী কট্টর এই ইসলামিক রাজনৈতিক দল নিজেদের প্রভাব বিস্তার করেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে। যার সুফল তাঁরা পেয়েছে এবারের নির্বাচনে। অনেকেই মনে করছেন, এবার বাংলাদেশের ক্ষমতায় বিএনপি। ফলে ইউনূসের ক্ষেত্রে যে বাধ্যবাধকতা ছিল, তা তারেকের জন্য থাকবে না। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করতে জামাত ও পাকিস্তান এই এলাকা ব্যবহার করতেই পারে। বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে ভারতে সীমান্তপার সন্ত্রাস, বেআইনি অনুপ্রবেশ ও জঙ্গি কার্যকলাপ বৃদ্ধিতে জামাত যদি সাহায্য করে তাহলে তা হবে তারেকের সরকারের কাছে চরম অস্বস্তিকর।












Discussion about this post