তিনিই বাংলাদেশের একমাত্র আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়। কয়েকমাস আগেই এই দাবি করেছিলেন বাংলাদেশের বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। বিদায়বেলাতেও তিনি প্রমান করার চেষ্টা করলেন তিনি সত্যিই আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্য বা সেভেন সিস্টার্স নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন মুহাম্মদ ইউনূস। বিদায়বেলাতেও সেই বিতর্ক জিইয়ে রাখলেন তিনি। বিদায়ী ভাষণে তিনি বললেন, আমাদের খোলা সমুদ্র কেবল ভৌগোলিক সীমারেখা নয়— এটি বাংলাদেশের জন্য বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার খোলা দরজা। নেপাল, ভুটান এবং সেভেন সিস্টার্সকে নিয়ে এই অঞ্চলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ, বিদায় নেওয়ার আগেও তিনি তারেক রহমান সরকারকে একটা অস্বস্তির মধ্যে রেখে যাচ্ছেন। উল্লেখ্য, উত্তর পূর্বাঞ্চলের সেভেন সিস্টার্স ভারতের জন্য অতি সংবেদনশীল। এই জায়গায় বারে বারে আঘাত করছেন মুহাম্মদ ইউনূস। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এটা পরিকল্পিত বক্তব্য। তিনি চাইছেন বাংলাদেশে তাঁর পাকাপাকি পুনর্বাসন। তাঁর পছন্দের জায়গা রাষ্ট্রপতিভবন। তবে তাঁকে কি রাষ্ট্রপতি পদে বসাবেন তারেক রহমান, এই প্রশ্নই এখন সর্বাগ্রে উঠছে। পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্নও উঠছে, মুহাম্মদ ইউনূস যদি বাংলাদেশ ছেড়ে যান, তাহলে কোথায় যাবেন তিনি।
এক মাস আগে সাংবাদিক সম্মেলন করে ইউনূস সাহেবের নির্বাচন-পরবর্তী পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছিল বাংলাদেশ অন্তর্বর্তী সরকার। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার জানিয়েছিলেন, দায়িত্ব ছাড়ার পরে মূলত তিনটি কাজে মনোনিবেশ করবেন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ। ছাত্রাবস্থায় শেখ হাসিনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের অনুরাগী ছিলেন ইউনূস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির এই মেধাবী ছাত্র হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ‘বাংলাদেশ সিটিজেনস কমিটি’ গড়ে আন্দোলনও করেছিলেন। পরবর্তী সময় শেখ হাসিনার সঙ্গেও ইউনূসের অত্যন্ত সুসম্পর্ক ছিল। কিন্তু গ্রামীণ ব্যাঙ্কের প্রতিষ্ঠার কিছুটা সময় পর হাসিনার সঙ্গে ইউনূসের সম্পর্কের অবনতি হয়। ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাঙ্ককে ‘সুদখোর’ বলে দাগিয়ে দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। ইউনূসকে বলা হয়েছিল ‘গরিবের রক্তচোষা’। হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্বেই ইউনূসের বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছিল দুর্নীতির একাধিক মামলা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার বিদায়ের পর সেই ইউনূসকেই ছাত্ররা প্রধান উপদেষ্টা করে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। যদিও এই পছন্দ আগে থেকেই করা ছিল। ক্ষমতায় এসেই তিনি নিজের উপর থাকা মামলাগুলি তুলে নেন। এবং তাঁর সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে যে করফাঁকির অভিযোগ ছিল, সেই করও মুকুব করিয়ে নেন। পাশাপাশি একাধিক নতুন সংস্থা চালু করেছেন তিনি প্রধান উপদেষ্টার পদে থাকাকালীনই। এবার ইউনূসের প্রধান উপদেষ্টার কার্যকাল শেষ হচ্ছে। তাই পুরোন মামলাগুলি পুনরায় চালু হওয়ার একটা আশঙ্কা থেকেই যায়। আজ না হয় কাল সেটা হতেই পারে। সেই কারণেই রক্ষাকবচ হিসেবে তিনি রাষ্ট্রপতি পদটিকেই পাখির চোখ করছেন। বর্তমান রাষ্ট্রপতি মহম্মদ শাহাবুদ্দিন আওয়ামী লীগ তথা হাসিনার ‘ঘনিষ্ঠ’ ছিলেন। নির্বাচনের আগেই তিনি একটি সাক্ষাৎকারে দাবি করেছিলেন নতুন সরকার এলে তিনি পদত্যাগ করতে পারেন। সেটা হলে, নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে কাউকে মনোনীত করতেই হবে তারেক রহমানের সরকারকে। সে ক্ষেত্রে ইউনূস হতে পারেন একটি জোরালো দাবিদার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাঁর নামই সুপারিশ করতে পারে।
আবার একটি মহল মনে করছেন, ইউনূস দ্রুত বাংলাদেশ ত্যাগ করবেন। যেমনটা তাঁর উপদেষ্টামণ্ডলীর অনেকেই চাইছেন। তবে তিনি ফ্রান্সে ফিরবেন, নাকি যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেবেন সেটা নিয়েও চলছে কাটাছেড়া। আবার কেউ কেউ দাবি করছেন, ইউনূস আপাতত পাকিস্তান বা মধ্যপ্রাচ্যের কোথাও যেতে পারেন। যতদিন না তাঁকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়। যদিও গত ১১ জানুয়ারি ইউনূসের তরফে তাঁর উপ-প্রেস সচিব জানিয়েছিলেন, দায়িত্ব ছাড়ার পর মূলত তিনটি কাজে মনোযোগ দেবেন। একটি হল, ‘ডিজিটাল হেলথকেয়ার ডেভেলপমেন্ট’। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের নারীদের স্বাস্থ্য পরিষেবায় অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ। দ্বিতীয়টি হল, শিল্প-বাণিজ্য ক্ষেত্রে তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির কার্যক্রম এবং তৃতীয়টি হল, যে ‘থ্রি জিরো তত্ত্ব’ নিয়ে তিনি দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করছেন, তাতে নতুন গতিসঞ্চারের চেষ্টা। ইউনূস বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা থাকাকালীন যে একাধিক দেশে সফর করেছেন, সেখানে মানবসম্পদ রফতানি নিয়ে একাধিক দেশে চুক্তি সেরে এসেছিলেন। মনে করা হচ্ছে, সেই কাজেই তিনি মনোনিবেশ করবেন।












Discussion about this post