ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বাংলাদেশের ক্ষমতায় এল বিএনপি। বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মঙ্গলবার শপথও নিয়ে নিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তাঁর মন্ত্রিসভাও তাঁর সঙ্গে শপথ নিয়েছে। আপাতত ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী শপথ নিয়েছেন তারেকের মন্ত্রিসভায়। ফলে এবার প্রশ্ন উঠছে, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু তাঁর আগের মন্তব্য অনুযায়ী যদি পদত্যাগ করেন, তাহলে নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে কাকে বেছে নেবেন তারেক রহমান। বেশ কয়েকজনের নাম সামনে এসেছে। এরমধ্যে ছিলেন বিএনপির মহাসচিব তথা বর্ষীয়ান নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কিন্তু তিনি মঙ্গলবার মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। মঙ্গলবার বাংলাদেশের সময় অনুসারে দুপুর সাড়ে ৩টে নাগাদ বাংলাদেশের সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজ়ায় নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন বিএনপি-র চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। প্রথম বারের জন্য মন্ত্রিসভায় এসেই প্রধানমন্ত্রী হলেন তারেক। পাশাপাশি, মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যে ১৭ জনই নতুন মুখ। আবার প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে ২৪ জনই নতুন মন্ত্রী হলেন। কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে যা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অলিন্দে তোলপাড় চলছে, তা হল মুহাম্মদ ইউনূস এবার কি করবেন? তিনি কি ফের বিদেশে ফিরে যাবেন, নাকি তাঁকেই রাষ্ট্রপতি করে বাংলাদেশে পাকাপাকি পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবেন তারেক রহমান। সূত্রের খবর, মার্চের প্রথম সপ্তাহে ঢাকা সফরে আসতে পারেন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস পল কাপুর। আগামী ৬ থেকে ৯ মার্চ ঢাকায় আসার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন পল কাপুর। ওয়াকিবহাল মহল মনে করছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে মার্কিন অংশীদারিত্ব বাড়ানোর থেকেও পল কাপুরের সফরে চিনের সঙ্গে সখ্যতা এড়ানোর বিষয়ে বেশি জোর দেওয়া হবে। বিএনপির আমলে যাতে বাংলাদেশ চিন নির্ভর না হয়ে পড়ে, সেটাই নিশ্চিত করতে চাইবেন পল কাপুর।
দ্বিতীয় সম্ভাবনা যে ধীরে ধীরে প্রবল হচ্ছে একটি উদাহরণ দিলেই স্পষ্ট হয়ে যাবে। এবারের তারেকের মন্ত্রিসভায় সবচেয়ে বড় চমক হল মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান। যিনি বিগত ইউনূস উপদেষ্টামণ্ডলীর সবচেয়ে বিতর্কিত চরিত্র হিসেবে পরিচিত। খলিলুর রহমানকে টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী করলেন তারেক। বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৬(২) অনুসারে, সে দেশের প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভায় সংসদের সদস্য নন এমন ব্যক্তিদেরও নিয়োগ করতে পারেন। তবে তাঁদের সংখ্যা হবে মন্ত্রিসভার মোট সদস্যের মাত্র এক-দশমাংশ। একেই বলা হয় টেকনোক্র্যাট কোটা। খলিলুরকে পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ানোয় জল্পনা বাড়ছে তাঁকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দিতে পারেন তারেক রহমান।
খলিলুরকে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের পর রাজনৈতিক মহলে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। বিগত দেড় বছরে রোহিঙ্গা সংকট, রাখাইন মানবিক করিডর প্রস্তাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তিতে খলিলুর রহমানের ভূমিকা কতটা সফল ছিল? নাকি এই বাণিজ্যচুক্তি এবং রাখাইন করিডোরের কাজ সম্পন্ন করতেই মার্কিন চাপে তাঁকে মন্ত্রিসভায় রাখা হল, সেটাও আলোচনার মধ্যে রয়েছে। আর এখান থেকেই অনেকের ধারণা, মুহাম্মদ ইউনূসও হয়তো এবার পুনর্বাসন পেয়ে যাবেন। তাঁকেই শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নিতে বাধ্য হবেন তারেক রহমান। প্রায় সব ক্ষেত্রেই ইউনূস এবং খলিলুর বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু তাঁরা মার্কিন স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন এবং তাঁদের জন্য একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বা চুক্তি করে রেখেছেন। তারেকের মন্ত্রিসভার মাধ্যমে এবার সেগুলির বাস্তবায়ন করা হবে, সেই কারণেই খলিলুরকে মন্ত্রী এবং ইউনূসকে রাষ্ট্রপতি করার তোড়জোড় শুরু হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফে। ২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস মার্কিন নাগরিক খলিলুর রহমানকে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সমস্যা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়াবলি সংক্রান্ত হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ নিয়োগ করেছিলেন। পরবর্তী সময় তাঁকে বাংদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে উন্নীত করা হয়। খলিলুর রহমানের নেতৃত্বে আলোচিত ‘মানবিক করিডর’ প্রস্তাব প্রথমে আরাকান আর্মিকে সহায়তার জন্য উত্থাপিত হলেও পরে এটিকে রোহিঙ্গা সহায়তার রূপ দেওয়া হয়। যা নিয়ে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের সেনাপ্রধানও। এবার সেই খলিলুরকেই মন্ত্রী করে তারেক কি সেনাপ্রধানকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেললেন? এবার কি ইউনূসকে রাষ্ট্রপতি করে জেনারেল ওয়াকার উজ জামানকে আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবেন?












Discussion about this post