অবশেষে বিদায় নিচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা তথা শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতি অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। অন্তত বিদায়ী ভাষণে তিনি এটাই দাবি করেছেন। তাঁর আরও দাবি, জুলাই আন্দোলনের আগের ‘অচল’ বাংলাদেশ এখন অগ্রগতির দেশ। জাতির উদ্দেশে ভাষণে মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, আমি আপনাদের কাছে বিদায় নেওয়ার জন্য উপস্থিত হয়েছি।’’ সেই সঙ্গে তাঁর বক্তব্য, তিনি সফল না ব্যর্থ, তা বিচার করবেন বাংলাদেশবাসী।
বিচার বাংলাদেশের মানুষ অবশ্যই করবেন। কিছুটা বিচার অবশ্য তাঁরা করেই ফেলেছেন ভোটের বাক্সে বিএনপিকে ঢেলে সমর্থন দিয়ে। বাকি বিচারও হবে বলে দাবি করছেন ওয়াকিবহাল মহলের একাংশ। বিগত আঠারো উনিশ মাসে মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের জন্য কি কি করেছেন, বা কতটা উপকার করেছেন তা নিয়ে শুরু হয়েছে কাটাছেড়া। আসুন আমরা একটু রিওয়াইন্ড করে দেখে নি অর্থনীতির অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশকে ঠিক কোথায় রেখে গেলেন।
জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে ইউনূস দাবি করেছেন, যাঁরা দেশকে লুটেপুটে খেতেন তাঁদের অনুগতেরা অভ্যুত্থানের সঙ্গে সঙ্গে পালিয়েছেন। এ ছাড়া বাকিরা হয় নিজেদের ভোলবদল করেছেন বা আত্মগোপন করে আছেন। ইউনুস সাহেব এর আগে দাবি করেছিলেন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। প্রতি ডলারের দাম ১২০ টাকা ধরলে বর্তমান বাজারদরে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ২৮ লক্ষ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতিবছর গড়ে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হাতে শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি এমনই তথ্য তুলে দিয়েছিল। কিন্তু ইউনূস সরকার তার হিসেব আজও প্রকাশ করতে পারেনি। বা করার সাহস দেখায়নি। অর্থাৎ তাঁর এই দাবি কতটা যুক্তিসঙ্গত এটা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। আবার বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে তিনি যা যা দাবি করেছেন সেটাও কার্যত ভুয়ো বলে মনে করছেন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।
অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে অর্থনীতি কতটা পাল্টালো? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন অর্থনীতিবিদরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মতো একটি দেশ, যারা নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশের দিকে যাত্রা করছিল, সেখানে এত নিম্ন অথনৈতিক প্রবৃদ্ধি একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। গত ডিসেম্বরে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি আট দশমিক ৪৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এই সরকার খুব একটা সাফল্য দেখাতে পারেনি। ক্ষমতায় আসার পর যে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে অন্তর্বর্তী সরকারকে পড়তে হয়েছে, সেগুলোর মধ্য একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা।সেখানেও ব্যর্থ ইউনূস সরকার। যে ভারত বিরোধিতাকে সামনে রেখে এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্রমাগত প্রচার করে গিয়েছে, বিপদে পড়ে তারাই ভারতের থেকে চাল, পিঁয়াজ, গম, আটা বা নিত্যপ্রয়োজনীয় আনাজপাতি ভারত থেকেই আমদানি করেছে। বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও একই পরিসংখ্যান।
মুহাম্মদ ইউনূস, যিনি বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা হয়েও একসময় দাবী করেছিলেন বাংলাদেশিরা জালিয়াতিতে বিশ্বসেরা। আজ বিশ্বের বহু দেশ বাংলাদেশিদের ভিসা দিতে অস্বীকার করছে। এর দায় এড়াতে পারেন না মুহাম্মদ ইউনূস। বহু বাংলাদেশী পড়ুয়া ইউরোপের বা ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চ শিক্ষা নিতে আসতে চান, কিন্তু প্রধান উপদেষ্টা বা বাংলাদেশের কোন রাষ্ট্রপ্রধানের এখানে মন্তব্যের পর বাংলাদেশী তরুণদের ভিসা দেবে তা খুব কঠিন ব্যাপার। বিশ্বের কোনও দেশেই এমন নজির নেই যেখানে রাষ্ট্রপ্রধান স্বয়ং নিজের দেশের নাগরিকদের জালিয়াত বলছেন।
বাংলাদেশের সব থেকে বেশি লাভদায়ক শিল্প হল রেডিমেড পোশাক। ইউনুসের আমলে এই ক্ষেত্র কার্যত কবরে চলে গিয়েছে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য ২০২৪ সাল ছিল সংকটময়। ২০২৫ সালে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও বাংলাদেশের সর্বোৎকৃষ্ট এই শিল্প কার্যতমুখ থুবড়ে পড়েছে। ২০০ থেকে ২৫০ টি কারখানা বন্ধ। অর্থনীতির অধ্যাপক ইউনুস সাহেব অনেকটা ইচ্ছাকৃতভাবেই এই শিল্পকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছেন। ফলে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ধাক্কা খেয়েছে। শেষ প্রচেষ্টা হিসাবে নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য শুল্ক চুক্তি কার্যত শেষ পেরেগ পুঁতেছে বাংলাদেশের রেডিমেড পোশাক শিল্পে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলো আমদানি করলে রপ্তানিতে শূন্য শূন্য আরোপিত হবে। ব্যাপারটা শুনতে যতটা ভালো লাগছে কার্যক্ষেত্রে ততটাই বিপদজনক। ভারত বাংলাদেশের জন্য ট্রানশিপমেন্ট বন্ধ রেখেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলো আমদানি করা অতটা সহজ হবে না। অর্থাৎ রেডিমেড পোশাক শিল্প এখনও ঘোর অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশের রেমিটেন্স কমেছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমেছে। বৈদেশিক বাণিজ্য কমেছে। কিন্তু ইউনুস সাহেব এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য হাকপাক করছেন। তিনি বিদায়ের ভাষণে যা যা বলেছেন খাতায়-কলমে তার একটাও হয়নি। তারেক রহমান কি তাকে রাষ্ট্রপতি হওয়ার সুযোগ দেবেন? নাকি যুক্তরাষ্ট্রের আবদারে বাকিটা মেনে নেবেন?












Discussion about this post