বিশ সাল বাদ।
এটি একটি বিখ্যাত হিন্দি সিনেমা। তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হওয়ার বিষয়টিকে বিখ্যাত এই হিন্দি সিনেমার শিরোনাম দিয়ে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। টানা দু’দশক ক্ষমতা বাইরে ছিল বিএনপি। অবশেষে পঞ্চম মেয়াদে বাংলাদেশের মসনদে জিয়া। প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা তথা বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সদ্যপ্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান। তাঁর প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হওয়ার সঙ্গে পরিসমাপ্তি ঘটল দীর্ঘ ১৮ মাসের একটি অসাংবিধানিক শাসনকালের। বাংলাদেশে শুরু হল গণতন্ত্রের জয়যাত্রা।
মঙ্গলবার বিকেল এক ঝলমলে অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দেশের একাদশতম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন তারেক জিয়া। একই দিনে শপথ নেন তার মন্ত্রীরা। মন্ত্রিসভার অন্যতম উল্লেখযোগ্য বিষয় তারেকের রান্নাঘর, অর্থাৎ ক্যাবিনেটে জায়গা হয়েছে তিন মহিলার। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পদে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় এ দিন অবশ্য আরও ১০ জনকে শপথবাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি। তারেকের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান আক্ষরিক অর্থেই বর্ণাঢ্য। দীর্ঘদিনের প্রথাম ভেঙে এবার বঙ্গভবনের পরিবর্তে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানটি হয় জাতীয় সংসদে দক্ষিণ প্লাজায়, খোলা আকাশের নীচে।
এ দিনের শপথ-অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি প্রায় ১,২০০ অতিথি উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ভারত, চিন, পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং তুরস্ক-সহ ১৩টি দেশের প্রতিনিধিরা। ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা নয়াদিল্লির প্রতিনিধিত্ব করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, তিন বাহিনীর প্রধান, কূটনৈতিক কোরের সদস্যরা। এবারের মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ আছে অনেক, যারা আগে কখনও মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হননি। প্রথমবার নির্বাচিত হয়েই মন্ত্রিসভায় জায়গা করে নেওয়া নেতাও আছেন। মন্ত্রীদের ২৫ জনের মধ্যে ১৭ জনই নতুন মুখ। প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে ২৪ জনই নতুন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও এবারই প্রথম মন্ত্রিসভার সদস্য হচ্ছেন।
তবে সব কিছুই যে তালে তালে মিলিয়ে হয়েছে, এমনটা বলা যাচ্ছে না। তবে সবটাই কিন্তু ভালোয়-ভালোয় মিটল না। সকালে সাংসদের শপথ অনুষ্ঠান ঘিরে নতুন জটিলতার জেরে তারেকের সরকারের শপথ-অনুষ্ঠান বর্জন করে জামায়াতে ইসলামি ও তাদের জোট শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। জামায়াত ও এনসিপির অভিযোগ, বিএনপি ‘জুলাই সনদ’-এ সই করেও আজ সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়নি। এদিকে, খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে নিয়োগ করায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, বিএনপিতে আর কোনও যোগ্য লোক ছিল না, যাকে ওই পদে নিয়োগ করা যেত? এই প্রশ্ন শুধু বাংলাদেশের রাজনৈতিকমহলেই ঘোরাফেরা করছে এমনটা নয়। আম আদমিরও এটি চর্চার বিষয়ে হয়ে উঠছে। কেন ইউনূসের নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে তারেক রহমান পররাষ্ট্রমন্ত্রকের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকের দায়িত্ব অর্পণ করলেন।
কে এই খলিলুর রহমান? ১৯৭৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন। দু বছর বাদে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (পররাষ্ট্র) ক্যাডারে যোগ দেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন ও কূটনীতিতে এমএ ও অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৮৩ থেকে ৮৫ , এই সময়ের মধ্যে খলিলুর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগে এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মেয়াদ শেষে তাঁকে নিউ ইয়র্কে জাতিসঙ্ঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে বদলি করা হয়। তিনি জেনেভায় জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনে (আঙ্কটাড) বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে জাতিসংঘ সচিবালয়ে যোগ দেন ১৯৯১ সালে। কেরিয়ারের ক্ষেত্রে তিনি নীল আকাশে অন্য একটি ধ্রুবতারা বললে অতিশয়োক্তি হবে না ঠিক। কিন্তু রাজনৈতিক কেরিয়ারে তাঁর অবস্থা ঠিক বিপরীত মেরুতে। এটা ওপেন সিক্রেট যে খলিলুর রহমান তদারকি সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা থাকাকালীন ডিপ স্টেটের হয়ে কাজ করতেন। তবে কি পরাষ্টরাষ্ট্রমন্ত্রী পদে তাঁর নিয়োগের ক্ষেত্রে মার্কিন মুলুক থেকে চাপ এসেছিল কোনওভাবে। তাছাড়া খলিলুর রহমানকে নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে বিএনপি জোরাল দাবি করেছিল। তারা তদারকি সরকার প্রধানের কাছে এক প্রতিনিধি দলও পাঠিয়েছিলেন। অনেকের সন্দেহ তারেক যে ধৈর্য্যের পরিচয় দিয়েছেন, ইউনূসকে নির্বাচনের ঘোষণা দিতে বাধ্য করেছেন। কোনও কোনও মহল থেকে বলা হচ্ছে, লন্ডনে তারেক রহমান এবং তদারকি সরকার প্রধান ইউনূসের যে বৈঠক হয়েছিল, তার নেপথ্যে ছিলেন খলিলুর রহমান। ওই বৈঠকের পর দুই পক্ষের সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে। তার প্রতিদান হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে খলিলুরকে নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নেন তারেক।












Discussion about this post