কোনও মতেই অচলবস্থা কাটছে না বাংলাদেশের। ভারতের অর্থায়নে এই মুহূর্তে আটটি প্রকল্পের কাজ চলছে। বলা ভালো নামেই কাজ চলছে, আসলে সেই কাজ খুব মন্থর গতিতে চলছে বা বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে। এর কারণ গত বছরের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান এবং শেখ হাসিনার সরকারের পতন। এই ঘটনার পর থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে। যদিও প্রথম প্রথম সবকিছু ঠিক ছিল। কিন্তু মুহাম্মদ ইউনূসের তদারকি সরকারের একাধিক উপদেষ্টা সরাসরি ভারতবিরোধী মন্তব্য করে গিয়েছেন। যা এই সম্পর্কে একটা শীতলতা নিয়ে এসেছে। ফলে ভারত লাইন অফ ক্রেডিটের আওতায় বাংলাদেশে যে সমস্ত প্রকল্প রূপায়ন করছিল সেই প্রকল্পগুলিতে এক এক করে অর্থ প্রদান কমিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া হিসেব বলছে, গত সাত মাসে অর্থাৎ গত বছরের জুলাই মাস থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত মাত্র আট কোটি ডলারের মতো অর্থ প্রদান করেছে ভারত।
ফলে ভারতীয় অর্থায়নে চালু হওয়া প্রকল্পগুলি নিয়ে বিপাকে পড়েছে বাংলাদেশ, বিশেষ করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। সূত্রের খবর, বাংলাদেশ রেলওয়ের দুটি প্রকল্পের কাজ আজ পর্যন্ত শুরুই হয়নি। এই দুটি রেল প্রকল্প হল খুলনা-দর্শনা ডবল লাইন এবং সিরাজগঞ্জ-বগুড়া মিশ্র গেজ লাইন। জানা যাচ্ছে ওই দুটি প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল প্রায় ছয় বছর আগে অর্থাৎ ২০১৮ সালে। কিন্তু কোনও কারণবশত ওই প্রকল্পের টাকা ভারত দেয়নি। অন্যদিকে বাকি চারটি রেল প্রকল্পের মধ্যে দুটি প্রকল্পের কাজ ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে। যেমন খুলনা-মোংলা রেলপথ এবং আখাউড়া-আগরতলা রেলপথ। এই দুটি রেলপথের কাজ ভারত পুরোদমে শেষ করলেও এখন একটিও ট্রেন চলে না। জানা যাচ্ছে, ঢাকা থেকে টঙ্গী তৃতীয় ও চতুর্থ লাইনের কাজের অগ্রগতি মাত্র ৩৮ শতাংশ হয়েছে। আর কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেলপথের কাজ ৫১ শতাংশ মতো শেষ হয়েছে। আবার দিনাজপুর-কাউনিয়া রেলপথের কাজ এখন প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। এই প্রকল্পগুলি শেষ করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের তরফে চিঠিও দেওয়া হয়েছিল গত বছরের ডিসেম্বর মাসে। কিন্তু এখনও ভারত সেই চিঠির কোনও জবাব দেয়নি বলেই খবর। ফলে বাংলাদেশ রেলওয়ে এখন বিপাকে পড়েছে ওই প্রকল্পগুলি ভারত সরকার আদৌ বাস্তবায়ন করবে কিনা এই ভেবে। ফলে ভারতীয় ঋণ নাও পাওয়া যেতে পারে ধরে নিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে নিজেই নতুন করে ঋণ পাওয়া যায় কিনা সেটা দেখছে।
বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে খবর, গত আগস্টে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারতের বেশ কয়েকটি প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে আশুগঞ্জ-আখাউড়া চার লেনের সড়কের ভারতীয় ঠিকাদার সংস্থা ভারতীয় কর্মী-আধিকারিকদের নিয়ে দেশে ফিরে এসেছিলেন। এরপর চারমাসের বেশি সময় সেই কাজ বন্ধ থাকার পর আংশিক কাজ শুরু হয়েছে। তবে কাজের গতি অস্বাভাবিক কম। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, ভারতের লাইন অফ ক্রেডিটের আওতায় যে আটটি প্রকল্পের কাজ চলছে সেগুলিতে বিগত সাত মাসে মাত্র ৮ কোটি ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা দিয়েছে ভারত। নতুন করে কোনও ঋণের প্রতিশ্রুতিও দেয়নি ভারত সরকার। বিগত অর্থবর্ষে ভারত যে অর্থ প্রদান করেছিল লাইন অফ ক্রেডিটের আওতায়, চলতি অর্থবর্ষের সাতমাসে সেটা চার ভাগের এক ভাগ মাত্র। কিন্তু গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বশেষ তিন বছরে ৩০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ দিয়েছিল ভারত। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারত ৩১ কোটি ১৪ লক্ষ ডলার এবং তার আগের দুই বছরে যথাক্রমে ৩৩ কোটি ৭০ লক্ষ ও ৩২ কোটি ৯৩ লক্ষ ডলার দিয়েছিল ভারত সরকার।
সূত্রের খবর, তিনটি লাইন অফ ক্রেডিটের আওতায় বাংলাদেশে সড়ক ও রেল যোগাযোগ, জ্বালানি, রাস্তাঘাট নির্মাণসহ অবকাঠামো খাতে এ পর্যন্ত ৩৬টি প্রকল্প নিয়ে দুই দেশ সম্মত হয়েছিল। এর মধ্যে ১৫টি শেষ হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে চলমান আছে আটটি প্রকল্প। আর বাকি ১৩টি প্রকল্প আলোচনার টেবিলে ছিল। বলা ভালো সবগুলি প্রকল্পই শেখ হাসিনার আমলে নেওয়া। ফলে ইউনূস সরকারের আমলে ভারত সেই প্রকল্পগুলি নিয়ে ধীরে চলো নীতি নিয়েছে। অথবা মুহাম্মদ ইউনূসের তদারকি সরকারকে মান্যতাই দিচ্ছে না নয়া দিল্লি। তাই চাপ বাড়াতে ভারত সেই সব প্রকল্পে টাকা দেওয়া অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। আর যা নিয়ে চাপ বেড়েছে বাংলাদেশের। চলতি মাসেই বাংলাদেশের এক প্রতিনিধি দল নয়া দিল্লিতে এসেছিল লাইন অফ ক্রেডিট নিয়ে আলোচনা করতে। কিন্তু ভারত সরকার সেরকম কোনও প্রতিশ্রুতি দেয়নি বলেই জানা গিয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে বাংলাদেশ সরকার ওই প্রকল্পগুলি নিয়ে যাচাই-বাছাইয়ের পরিকল্পনা করছে বলেই সূত্রের খবর।
Discussion about this post