ভারত থেকে আমদানি পণ্যের উপর ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাও আবার নির্ধারিত সময়ের তিনদিন আগেই। গোটা বিশ্ব অবাক, যে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ট্রাম্প অসম্ভব আশাবাদী ছিলেন, তিনি নিজেও বলেছিলেন সবচেয়ে বড় বাণিজ্য চুক্তি হতে যাচ্ছে ভারতের সঙ্গে। সেই ট্রাম্প কেন আচমকা ভারতের উপর এতটা ক্ষিপ্ত হলেন? এই প্রশ্নের এখন উত্তর খুঁজতে ব্যাস্ত কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। ভারতীয় রফতানি পণ্যের ওপর বাড়তি ২৫ শতাংশ মার্কিন ট্যারিফ চাপানোয় ভারতের অর্থনীতি কি ধাক্কা খাবে? ভারতের জিডিপি কি থমকে যাবে? এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে কার্যত দ্বিধাবিভক্ত ওয়াকিবহাল মহল।
তবে একটা বিষয় স্পষ্ট, ভারত কোনও ভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে মাথাণত করছে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নানা ভাবে ভারতকে চাপ দিয়ে চলেছেন, তবুও ঝুঁকতে নারাজ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এমনকি মার্কিন ট্যারিফ ধাক্কার পর ভারতও পাল্টা ধাক্কা দিয়েছে ওয়াশিংটনকে। জানা যাচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম প্রযুক্তির যুদ্ধবিমান এফ-৩৫ বিক্রির প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে। যদিও এই ব্যাপারে নয়া দিল্লি স্পষ্ট করে কিছুই জানায়নি। তবে, মার্কিন সংবাদ মাধ্যম ব্লুমবার্গ ভারতের উচ্চপদস্থ এক কর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, নয়া দিল্লি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এফ ৩৫ স্টিলথ ফাইটার জেট কেনার ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের দাবি, এটা মার্কিন শুল্ক বোমার পাল্টা চাপ ভারতের। ভারত এমনিতেই রাশিয়ার এসইউ ৫৭ স্টিলথ ফাইটার জেট কেনার বিষয়ে আগ্রহী। কারণ রাশিয়া ভারতকে এই পঞ্চম প্রজন্মের ফাইটার জেটের সঙ্গে যাবতীয় প্রযুক্তিও হস্তান্তর করতে রাজি। যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দিতে রাজি নয়। আর রইল রাশিয়ার থেকে তেল ও গ্যাস আমদানি করার বিষয় নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নয়া দাবি, ভারত নাকি আর রাশিয়ার থেকে তেল কিনবে না। কিন্তু ভারতের বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র স্পষ্ট জানিয়েছেন, এমন কোনও খবর তাঁর কাছে নেই।
ফলে বোঝাই যাচ্ছে, ভারত কোনও মতেই ট্রাম্পের চাপের কাছে নতীস্বীকার করতে রাজি নয়। কিন্তু মার্কিন ২৫ শতাংশ শুল্ক ভারতের বাণিজ্য কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে? অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রথম দিকে অনেকটাই ধাক্কা খাবে ভারতের বাণিজ্য। কারণ, বহু তথ্য প্রযুক্তি সংস্থা ও ওষুধ কোম্পানি শুধুমাত্র আমেরিকার ওপর ব্যবসা দাঁড় করিয়েছে। তাঁরা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ভারতের মোট বৈদশিক বাণিজ্যর ১৮ শতাংশই আমেরিকার সঙ্গে। জেনেরিক ওষুধ, পোশাক, প্রযুক্তি ও ভারী ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের অনুসারী পণ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হয়। মজার বিষয় হল, আমেরিকার বেশিরভাগ মোটরগাড়ি, বিমান বা ভারী গাড়ি শিল্পের স্পেয়ার পার্টস ভারতেই তৈরি হয়। আপেলের আই ফোন ভারতে তৈরি হয়। ফলে বাড়তি ট্যারিফের ধাক্কায় ওই শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা পরক্ষে মার্কিন পণ্যের ওপরেই প্রভাব ফেলবে। সূত্রের খবর, ইতিমধ্যেই আমেরিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে উঠছে।
আসলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাঁদের কৃষি ও দুগ্ধজাত পণ্য ভারতের বাজারে পাঠাতে চায়। কিন্তু নয়া দিল্লি তাতে রাজি নয়। আর এই একটি বিষয়েই দুই দেশের বাণিজ্য চুক্তি আটকে আছে। অভিযোগ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড ফসল ভারতের বাজারে ঢুকলে ভারতের কৃষকদের অবস্থা যেমন সঙ্গিন হবে, তেমনই ভোক্তাদের শারীরিক সমস্যায় পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একইভাবে মার্কিন ডেয়ারি প্রোডাক্ট বা দুগ্ধজাত পণ্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। অভিযোগ, সেখানকার গরু বা মহিষদের আমিষ খাবার দেওয়া হয়। যা ভারতের ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করতে পারে। তাই, ভারতীয় প্রশাসনের শীর্ষ সূত্র জানিয়েছে, কৃষি এবং দুগ্ধজাত পণ্য-সহ সংবেদনশীল খাতে কোনও ছাড় দেওয়ার প্রশ্নই নেই। নয়া দিল্লির দাবি, কৃষকদের স্বার্থই আমাদের কাছে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। কোনও চাপে আমরা নত হব না— সরকার এই বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট। অন্যদিকে, বিশেষজ্ঞ মহলের একটা বড় অংশ মনে করছেন, মার্কিন শুল্কের প্রভাব ভারতীয় বাজারে খুব একটা বড়সড় নয় এবং তা মোকাবিলা করা সম্ভব। কারণ ভারত নিজেই সবচেয়ে বড় ভোক্তা। পাশাপাশি অন্য দেশগুলির সঙ্গেও ভারত বাণিজ্য চুক্তি করছে। সবমিলিয়ে চাপ এখন ট্রাম্পের কোর্টে।












Discussion about this post