জুলাই বিপ্লব ও আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় লুট হয়েছিল বাংলাদেশের শতাধিক থানা। অভিযোগ ছিল, অধিকাংশ থানার মজুত অস্ত্রশস্ত্র লুট করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। গণঅভ্যুত্থান এবং নতুন সরকার গঠনের এক বছর পার করার পরও সেই অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি বাংলাদেশের পুলিশ ও সেনাবাহিনী। যা নিয়ে কম বিতর্ক হচ্ছে না। এই আবহেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে বড়সড় পুরস্কার ঘোষণা করল বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সর্বোচ্চ পুরস্কার ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত। গত সোমবার বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সচিবালয়ে আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটির সভা শেষে এই পুরস্কার ঘোষণা করেন। এরপর থেকে শুরু হয়েছে আরেক বিতর্ক।
প্রসঙ্গত গত বছর বাংলাদেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন। দায়িত্ব নিয়েই তিনি বিভিন্ন হাসপাতালে ছুটে গিয়েছিলেন জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে আহতদের দেখতে। সেই সময়ই তিনি হাসপাতালের বাইরে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আমার আশ্চর্য লাগছে, বেশিরভাগই পুলিশের গুলিতে আহত হননি, দেখে মনে হচ্ছে বাইরের কেউ তাঁদের গুলি করেছে।
আসলে ভুল করেই তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন বলে ফেলেছিলেন যে পুলিশের গুলিতে সকলে মারা যাননি। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন এই ধরণের মারাত্মক রাইফেল দুস্কৃতিদের হাতে কে বা কারা তুলে দিয়েছিল? তিনি এও দাবি করেছিলেন, এই ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত হবে। কিন্তু বিগত এক বছরে সেই তদন্ত এক পাও এগিয়েছে কিনা সেটাই জানা যায়নি। বরং সাখাওয়াত হোসেনকেই স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা পদ হারাতে হয়েছিল। এক বছরে একটা অস্ত্রও উদ্ধার করতে পারেনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। বর্তমান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানালেন, যে বা যারা লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে সাহায্য় করবেন, তাঁদের আর্থিক পুরস্কার দেওয়া হবে। কটা শর্ট গান কিংবা পিস্তল উদ্ধার করে দিতে পারলে ৫০ হাজার টাকা, চায়না রাইফেল ও এসএমজি উদ্ধার করে দিতে পারলে পুরস্কার দেওয়া হবে ১ লাখ টাকা। আর একটা এলএমজি রাইফেল উদ্ধার করে দিতে পারলেই ৫ লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে বলে জানিয়ে দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। সেই সঙ্গে তিনি জানান, প্রতিটি কার্তুজের জন্য ৫০০ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। পুরস্কার তো ঘোষণা হল, কিন্তু যে সমস্ত পুলিশকর্মীরা মারা গিয়েছিলেন, তাঁরা কি সুবিচার পাবেন? এই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বেশি মাথাচারা দিয়ে উঠছে। এই বিষয়ে বাংলাদেশ পুলিশের কর্মকর্তারাই বলছেন, যে কোনও হত্যাকাণ্ডেরই বিচার হওয়া উচিত। প্রকৃত দোষীদের খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনা উচিত। তা না হলে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হবে না। কিন্তু শুধু আন্দোলনে নিহতদের বিচার করা হচ্ছে। পুলিশ সদস্য হত্যাকাণ্ডের বিচার হওয়া নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ এই প্রশ্নও তুলছেন, গত বছর ৫ থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে যে যে হত্যা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার শিকার ব্যক্তিরাও ন্যায়বিচার থেকে কেন বঞ্চিত হবেন?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দাবি করছেন, বাংলাদেশ পুলিশের অবস্থা এখন সবচেয়ে খারাপ। একদিকে এতজন সহকর্মীদের হত্যার দায়মুক্তি দিয়ে দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় পুলিশ সদস্যরা কে কোথায় দায়িত্ব পালন করেছেন তা জানতে চাওয়া হয়েছে। দুইয়ের ধাক্কায় সবচেয়ে বেশি হতাশায় ভুগছেন নিচু তলার পুলিশকর্মীরা। মজার বিষয় হল, বাংলাদেশের বর্তমান নৌ পরিবহন উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন এক বছর পরও দাবি করলেন এখনও এর তদন্ত হয়নি। তিনি নিজের আগের অবস্থানে অনঢ় থেকে এও জানিয়েছেন, ৭ পয়েন্ট ৬২ রাইফেল থেকে নিপুন হাতে ছাত্রনেতাদের ঠিক কপালে গুলি করা হয়েছিল। যা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দ্বারাই সম্ভব।
বাংলাদেশের একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা দাবি করেছিলেন, হত্যাকাণ্ডের শিকার সব পুলিশ সদস্য যে ডিউটিরত অবস্থায় নিহত হয়েছেন তা কিন্তু নয়। কেউ কেউ কর্মস্থল থেকে সাদা পোশাকে বাড়ি ফেরার পথেও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। আবার কাউকে বাড়ির সামনেই নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এর থেকেই বোঝা যায়, কে বা কারা এই পুলিশ হত্যার সঙ্গে জড়িত। তাঁদের আড়াল করতেই হত্যার বিচার না করে লুট হওয়া অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধারের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে দিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।












Discussion about this post