দেশ শাসনের ভার হাতে নেওয়ার পর থেকে রাষ্ট্রপরিচালনায় একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। প্রশাসনিক সংস্কার, দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা, জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়ায়, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, শিক্ষা ও স্থাস্থ্যখাতে কাঠামোগত পরিবর্তন। এমন নানা নীতির মাধ্যমে তিনি একটি তিনি রাজনৈতিক বার্তা দিতে চাইছেন। সরকার প্রধানের এই সব উদ্যোগ বিভিন্ন মহলে প্রশংসা কুড়িয়েছে। তবে একই সঙ্গে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীর বিতর্কিত মন্তব্য সেই ইতিবাচক বার্তাকে ম্লান করে দিচ্ছে কি না, তা নিয়ে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। বিশেষ করে পরিবহন, সংস্কৃতি, জ্বালানি এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রকের কয়েকজন মন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্য সরকারের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নচিহ্নের মধ্যে ফেলেছে। সমালোচকদের মতে, এই সব ব্যক্তিগত মন্তব্য নয়, বরং সরকারের সামগ্রিক অবস্থান নিয়েই জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করবে। সবচেয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে পরিবহনমন্ত্রী শেখ রুবিউল আলম। তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। যদিও তিনি সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তাঁর মতে, সড়ক এবং পরিবহনখাতে বিভিন্ন যানবাহন থেকে ‘সমঝোতার ভিত্তিতে’ যে টাকা নেওয়া হয়, সেটিকে চাঁদা বলতে চান না সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তবে ‘বাধ্য’ করে যে টাকা নেওয়া হয় সেটিকে চাঁদা আখ্যায়িত করে ‘এরকম চাঁদাবাজির কোন সুযোগ নেই’ বলেছেন তিনি। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তারেক রহমানের এই মন্ত্রী বলেন, “ মালিক সমিতি, শ্রমিক সমিতি নিজেদের কল্যাণে জন্য নির্দিষ্ট হারে অর্থ তোলে। এটি এক ধরনের অলিখিত বিধির মতো। ” তাঁর যুক্তি অনুযায়ী, চাঁদা সেই অর্থে যা কেউ দিতে চায় না বা বাধ্য হয়ে দেয়। কিন্তু পরিবহন খাতে সংগঠনগুলি তোলা অর্থ না কি সমঝোতার ভিত্তিতে সংগৃহীত হয়। প্রশ্ন হল, বাস্তবে সেই সমঝোতা কতটা স্বতস্ফূর্ত এবং কতটা ক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর নির্ভরশীল। কারণ, বাংলাদেশের সড়ক ও পরিবহন খাতে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলির শক্ত অবস্থান ও পুরনো এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অস্বীকার করার উপায় নেই। রবিউল আলম আরও বলেন, “ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন সহ অনেক সংস্থা আছে। তারা এটা সমঝোতার ভিত্তিতে করে। সেখানে আবার প্রাধান্য পায় যখন যার প্রভাব থাকে। এমন মালিকদের বা দলের প্রভাব থাকে। যে দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলের শ্রমিক সংগঠনের একটা আধিপত্য থাকে। কিন্তু এটা চাঁদা আকারে আমাদের কাছে দেখার সুযোগ হচ্ছে না। কারণ, তারা সমঝোতার ভিত্তিতে করছে। ”
মন্ত্রী বলেছেন, যখন যাঁর প্রভাব থাকে, তখন তাঁর দলের শ্রমিক সংগঠনের আধিপত্য দেখা দেয়। এই স্বীকারোক্তি আসলে সমস্যার গভীরতা প্রকাশ করে। যদি ক্ষমতসীন দলের প্রভাবেই সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হয়, তবে সেটা কতটা স্বতন্ত্র ও সমঝোতাভিত্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব হল সকল নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। কিন্তু পরিবহনখাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাখাতে রাজনৈতিক প্রভাব ও অলিখিত বিধির মাধ্যমে অর্থ আদায়কে স্বাভাবিক হিসেবে দেখানো হয়, তাহলে জনগণের আস্থায় চিড় ধরাতে পারে।
২০২৪-য়ের ৫ মার্চ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে, দেশের মালিকানাধীন বাস ও মিনিবাস থেকে বছরে এক কোটি ৫৯ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয়। এই চাঁদার ভাগ পান দলীয় পরিচয়ধারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা-কর্মচারী, মালিক-শ্রমিক সংগঠন ও পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন প্রতিনিধিরা। গবেষণা আরও এসেছে, দেশের বৃহৎ বাস কোম্পানির প্রায় ৯২ শতাংশ পরিচালনার সঙ্গে রাজনীতিবিদেরা জড়িত। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পরিহন খাতের চাঁদার নিয়ন্ত্রণ করতেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। আওয়ামী লীগের পতনের পর এর নিয়ন্ত্রণ এসেছে বিএনপি পন্থীদের হাতে।












Discussion about this post