সময়ের হাত ধরে বদলে যায় জাতীয় বা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গন। বেশ কয়েক বছর আগে দুনিয়ায় আমেরিকার পরিচয় ছিল অভিভাবক বা নিয়ন্ত্রক। কোনও কিছু হলেই সবাই ওয়াশিংটনের শরণাপন্ন হত। পুরো দুনিয়ার রিমোর্ট কন্ট্রোল ছিল তাদের হাতে। তাই কোনও কিছু হলে বিভিন্ন দেশ আমেরিকার দ্বারস্থ হত। সময় বদলেছে। ট্রাম্প ভেবেছিলেন শক্তি মানেই একা দাঁড়াবার সাহস। তিনি মনে করতেন দর কষাকষি আন্তর্জাতিক রাজনীতির একমাত্র ভাষা। তাই, আমেরিকা পুরনো মিত্রদের সঙ্গে কথা বললেন একজন ব্যবাসীয়র মতো। ন্যাটোর হাতে তারা ধরিয়ে দিল হিসেবের খাতা। জলবায়ু চুক্তি থেকে তারা বেরিয়ে এসেছে। বিশ্বের উদ্দেশ্যে তাদের বার্তা – আমেরিকা আগে, বাকিরা পরে। তাই, আমেরিকার সঙ্গে তাদের মিত্রদের তৈরি হল দূরত্ব। বিগত বছরে আমেরিকা বহু দেশের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে। বহু দেশকে তারা করতলগত করেছে। কিন্তু কোনওদিন তারা একা হয়ে পড়েনি। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ তাদের এক ঘরে করে দিয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আমেরিকার শক্তি শুধু অস্ত্র বা অর্থনীতির জন্য ছিল না, ছিল তার বন্ধুদের জন্য। আমেরিকার মিত্ররা সবাই মিলে একটি অদৃশ্য জাল বোনে। ট্রাম্প এসে সেই জালের সুতো একে একে টানতে শুরু করলেন। আজ আমেরিকার মিত্ররা ওই দেশের সঙ্গে নিজেদের দূরত্ব তৈরি করেছে। তারা এখন আমেরিকার বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করেছে। এই যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প নিজের ঘরেই প্রতিবাদের সামনে পড়েছেন। ইউরোপ এখন নিজেদের প্রতিরক্ষা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। মিত্রদের চোখে আমেরিকা এখন সন্দেহের রেখা। ফলে, একটা শূন্যস্থান তৈরি হয়েছে।
জাতীয় হোক বা আন্তর্জাতি রাজনীতির অঙ্গনে শূন্যস্থান চিরকাল শূন্য থাকে না। একজন সরে গেলে জায়গা আরও একজন দখল করে। শূন্যস্থান দখল করে নিয়েছে চিন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, চিন কখনও সদম্ভে কিছু ঘোষণা করেনি। আমেরিকা যখন চড়া হারে বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করতে শুরু করে, সেই সময় বিভিন্ন দেশ বিকল্প বাজারের সন্ধান শুরু করে। রাজনীতির ইতিহাসে বড়ো পরিবর্তন তাই যুদ্ধ দিয়ে নয়, বিশ্বাসের পরিবর্তন দিয়ে ঘটে। ট্রাম্প তাঁর পেশির জোর দেখাতে গিয়ে বিশ্বাসের জায়গাটা নাড়িয়ে দিয়েছেন। বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে তা জোরা লাগানো খুব কঠিন হয়ে পড়ে।
যুদ্ধ শুরুর পর আমেরিকা তাদের মিত্রদেশগুলির কাছে সাহায্য চেয়েছিল। আর্জি জানিয়েছিল দেশটির পাশে থাকার। কাদের কাছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আর্জি জানিয়েছিলেন। চিন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাহায্য চেয়েছিলেন। সাহায্য চেয়েছিল অস্ট্রিলায়র কাছে। জাপান ও অস্ট্রেলিয়া জানিয়ে দিয়েছে, তারা ওই নৌপথ পাহারা দেওয়ার জন্য কোনও যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে না। ফাইনান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, হরমুজ প্রণালী বিশ্বব্যাপী তেল পরিবহনের জন্য একটি গুরূত্বপূর্ণ পথ। তিনি আশা করেন চিন ওই বন্ধ থাকা পথ খুলতে সাহায্য করবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জোর দিয়ে বলেন, চিনেরও সাহায্য করা উচিত। কারণ, চিন তাদের তেলের ৯০ শতাংশ এই প্রণালী দিয়ে নিয়ে যায়। চিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রকের এক মুখপাত্র রাষ্ট্রপ্রধানদের কুটনীতি চিন-আমেরিকার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্পের যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আর্জির প্রসঙ্গে মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, সাম্প্রতিক উত্তেজনা বাণিজ্য পথকে ব্যবহৃত করেছে এবং আঞ্চলিক সেই সঙ্গে বৈশ্বিক শান্তি নষ্ট করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্পের দাদাগিরি কি শেষ হতে চলেছে? মার্কিন সেনেট সদস্য ক্রিস মারফির সাম্প্রতিক মন্তব্য অন্তত সেই ইঙ্গিত দিচ্ছেন। এক্স হ্যান্ডেলে তিনি একটি পোস্ট করেন। মারফির দাবি, ট্রাম্প ইরানকে যতটা দূর্বল ভেবেছিলেন, তেহরা তার চেয়েও বেশি বিধ্বংসী রূপে পাল্টা আঘাত হানছে। মারফির ভাষায় এটা এখন দিনের আলোর মতো পরিষ্কার যে ট্রাম্প এই যুদ্ধের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছেন। পুরো অঞ্চল এখন জ্বলছে।












Discussion about this post