সম্প্রতি ভারত সরকারের নির্দেশে গোটা ভারতেই বেআইনি অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশীদের চিহ্নিত করে আটক করা হচ্ছে। উল্লেখযোগ্যভাবে দেশের জিপি শাসিত রাজ্য গুলি যেমন অবৈধ বাংলাদেশিদের পাকড়াও করতে বেশি তৎপর, তেমনই কয়েকটি অবিজেপি রাজ্যও অবৈধভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের আটক করছে। সম্প্রতি আটক হওয়া অবৈধভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিএসএফ বাংলাদেশ পুশব্যাক করছে। অর্থাৎ, তাঁদের কার্যত জোর করে তাঁদের বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে তাঁদের দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। ভারতের এই পুশব্যাক নিয়ে বাংলাদেশ তদারকি সরকারের প্রবল আপত্তি থাকলেও, তাঁরা কার্যত অসহায়। ঢাকার তরফ থেকে নয়া দিল্লিতে চিঠিও এসেছে, আবার বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি ফ্ল্যাগ মিটিং ডেকে ভারতের বিএসএফ-কে তাঁদের আপত্তি জানাচ্ছে। কিন্তু, ভারতের মোদি সরকার বাংলাদেশের কোনও কথাতেই কর্ণপাত করছে না। ফলে বাংলাদেশ সীমান্তে পুশব্যাক অব্যাহত, আর ভারতের পুশ-ইন নিয়ে জেরবার ঢাকা। তবে এই প্রতিবেদন বাংলাদেশী অনুপ্রবেশ নিয়ে ভারতের রাজনীতির বিষয়ে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ভূমিকা নিয়ে।
বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়, ভারতে প্রায় ২ কোটি বেআইনি বাংলাদেশী অবস্থান করেন। যারা কোনও পাসপোর্ট ও ভিসা ছাড়াই লুকিয়ে ভারতে এসেছেন। এঁদের মধ্যে বেশিরভাগই কুড়ি থেকে তিরিশ বছর ভারতে রয়ে গিয়েছেন। পাশাপাশি এই অবৈধ বাংলাদেশিরা নানা উপায়ে ভারতের ভোটার কার্ড, আধার কার্ড ও প্যান কার্ডের মতো পরিচয় পত্রও জোগাড় করে ফেলেছেন। তাঁদের সন্তানরা ভারতেই জন্মেছে, আর এখানকার স্কুল কলেজে পড়াশোনা করে। কিন্তু তাঁদের পিতা-মাতারা কেউই জন্মসূত্রে ভারতীয় নন। এখন এঁদের অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করার পরই সমস্যার শুরু। রাজস্থান, গুজরাট, উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, ওড়িশা, বিহার ও মধ্যপ্রদেশের মতো রাজ্যে যাদের অবৈধ বাংলাদেশী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, দেখা যাচ্ছে তাদের ভারতীয় পরিচয় পত্র অর্থাৎ ভোটার বা আধার কার্ড পশ্চিমবঙ্গ থেকে তৈরি করা হয়েছে। সেই ভোটার বা আধার কার্ডের ঠিকানাও পশ্চিমবঙ্গের কোনও জেলা। এখন সমস্যা হচ্ছে এই পশ্চিমবঙ্গে এবং বাংলাদেশে একই ভাষা, অর্থাৎ বাংলা ভাষা। কোন কোন ক্ষেত্রে ভিন রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকদের বাংলায় কথা বললেই তাদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে, তাদের সমস্ত পরিচয় পত্র বা কাগজপত্র যাচাইয়ের কাজ করছে সেই রাজ্যের প্রশাসন। যা নিয়ে আপত্তি তুলছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার দাবি বাংলা ভাষায় কথা বললেই বাংলাদেশী বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
অপরদিকে পশ্চিমবঙ্গের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি দাবি করছে, ‘ভোটব্যাঙ্ক’ অক্ষুণ্ণ রাখতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের বৈধ নাগরিকদের সঙ্গে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের গুলিয়ে দিতে চাইছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্য বিজেপির অন্যতম সাধারণ সম্পাদক জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের বৈধ বাসিন্দা এবং অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের ‘এক দাগে দাগিয়ে দিয়ে’ মুখ্যমন্ত্রী আসলে অনুপ্রবেশকারীদের বৈধতা দিতে চাইছেন। ওই বিজেপি নেতার বিস্ফোরক দাবি, নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রদূত আসার এক সপ্তাহের মধ্যে প্রথম সফর করেছেন কলকাতায়। তিনি নবান্নে এসে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। কাকতালীয় ভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দিল্লি ফিরে যাওয়ার পরদিনই মুখ্যমন্ত্রী বিষয়টি জোর দিয়ে উত্থাপন করেছেন।
রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের মতে, সেই বাম জমানা থেকেই পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশের রমরমা। মোটা টাকা ঘুষ দিয়ে ভারতের নাগরিকত্ব আদায় করে নিয়েছেন বহু বাংলাদেশী। তৃণমূল জামালাতে এই কারবার আরও ফুলে উঠেছে। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী কয়েকটি জেলা যেমন মুর্শিদাবাদ নদীয়া মালদাহ বা দুই চব্বিশ পরগনায় প্রচুর বাংলাদেশী নাগরিকের বসবাস। এরাই মূলত তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্ক। আর এই অবৈধ বাংলাদেশিরা পশ্চিমবঙ্গ থেকে ভারতের পরিচয় পত্র জোগাড় করে বিভিন্ন রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ নিয়ে পাড়ি জমিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী এখন তাদের হয়ে কথা বলছেন বলে দাবি বিজেপির। যদিও তৃণমূলের তরফে এই দাবি খণ্ডন করা হয়েছে। এমনকি রাজ্য সরকার আদালতের পর্যন্ত দ্বারস্থ হয়েছে বাংলাভাষীদের হেনস্থার অভিযোগে। এখন প্রশ্ন বাংলাভাষী মাত্রই কি দেশের বৈধ নাগরিক নাকি বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা বাংলায় কথা বলেন বলে বৈধ হয়ে যায়? মুদ্রা কথা হল ভোটব্যাঙ্ক, তাই অবৈধ কোন কোন সময় বৈধ হয়ে যায়।












Discussion about this post