সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ২০১৬ সালের স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে চাকরি পাওয়া শিক্ষাকর্মীদের চাকরি গিয়েছিল শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সাথেই। পরবর্তী সময় রাজ্য সরকারের আবেদনে সাড়া দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট শিক্ষক-শিক্ষিকাদের আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত ছাড় দিলেও কোপ পড়ে গ্রুপ সি ও ডি কর্মীদের ওপর। মানবিক কারণ দেখিয়ে তাঁদের বিশেষ ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্য সরকার বিজ্ঞপ্তিও জারি করে। কিন্তু এই ভাতা দেওয়া বেআইনি দাবি করে কলকাতা হাইকোর্টে ফের মামলা হয়। শুক্রবার সেই মামলার রায় দিল হাইকোর্ট। বিচারপতি অমৃতা সিনহা তাঁর রায়ে জানিয়ে দিয়েছেন, ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বা আদালত যতদিন না পরবর্তী নির্দেশ দিচ্ছে ততদিন ভাতা দিতে পারবে না রাজ্য সরকার। অর্থাৎ অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ জারি হল। হাইকোর্টের এই রায়ে রাজ্য সরকার আরেকবার ধাক্কা খেল বলেই মনে করছেন আইনজীবীদের একাংশ। আবার একটি অংশের অবশ্য দাবি, আদালতের রায় আপাতত কয়েক কোটি টাকার আর্থিক বোঝা থেকে রেহাই দিল নবান্নকে। এই তর্কের মাঝে বড় বিতর্কের সৃষ্টি করলেন তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ। তার পরেই বিষয়টি নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতর।
বাংলার রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ বলেন, কুণাল ঘোষ যে কোনও কঠিন পরিস্থিতিতেও মুখ্যমন্ত্রীর ঢাল হয়ে দাঁড়াতে ওস্তাদ। এবারও তিনি সেটাই করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু যেখানে পাহাড়প্রমান দূর্নীতির কারণেই সুপ্রিম কোর্ট গ্রুপ সি ও ডি শিক্ষাকর্মীদের চাকরি বাতিলে অনড় ছিল। তাঁদের বেতনের টাকাও ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিল। সেখানে মানবিক কারণে তাঁদেরই বিশেষ ভাতা দেওয়া কেন? প্রশ্ন উঠছিল, তৃণমূল দুর্নীতি প্রসঙ্গে একটা কথাও বলছে না। যোগ্য-অযোগ্যদের আলাদা করার উপায় নিয়েও কিছু বলছে না। বরং সবার চাকরি যাতে থাকে সেই চেষ্টায় বারবার আদালতের দরজায় কড়া নাড়ছে রাজ্য সরকার। জনগণের করের টাকা ধ্বংস করে হারবে জেনেও কোটি কোটি টাকা খরচ করছে আইনজীবীদের জন্য। এবার গ্রুপ সি কর্মীদের ২৫ হাজার এবং গ্রুপ ডি কর্মীদের ২০ হাজার টাকা করে মানবিক ভাতা দেওয়ার কথা ঘোষণা করে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। যা সম্পূর্ন বেআইনি। কলকাতা হাইকোর্ট তাঁর নির্দেশে জানিয়েছেন, ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বা আদালত যতদিন না পরবর্তী নির্দেশ দিচ্ছে ততদিন ভাতা দিতে পারবে না রাজ্য। আদালত জানিয়েছে, চার সপ্তাহের মধ্যে রাজ্যকে হলফনামা জমা দিতে হবে। তার ১৫ দিনের মধ্যে পাল্টা হলফনামা দেবেন মামলাকারীরা।
আইনজীবী ফিরদৌস শামীম আরও জানান, পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির প্রমাণ মেলায় সুপ্রিম কোর্ট ২৬ হাজার চাকরি বাতিল করেছিল। এই শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের ক্ষেত্রেও যোগ্য-অযোগ্য বাছাই হয়নি। রাজ্য সরকার চেয়েছিল এদের আরও কিছুদিন স্কুলে যাওয়া চালু রাখতে কিন্তু সর্বোচ্চ আদালত সেটাতেও মান্যতা দেয়নি। তাই ভাতার বিষয়টিই কার্যত আইনসিদ্ধ হতে পারে না। আদালত যাই বলুক, তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ বলে দিয়েছেন ‘মানবিক’ মুখ্যমন্ত্রী চাকরিহারাদের সমস্যার কথা ভেবেই ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেটা নিয়েও আপত্তি করে আদালতে যাওয়া হল। আরও একধাপ এগিয়ে তাঁর নির্দেশ, সরকারের মানবিক সিদ্ধান্ত আটকাতেও কারা কোর্টে গেলেন, তাঁদের চিহ্নিত করুন।
কলকাতা হাইকোর্ট শিক্ষাকর্মীদের ভাতা দেওয়ায় অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দেওয়ায় বিজেপির বক্তব্য, হাই কোর্টের এই রায় ‘দুর্নীতিগ্রস্ত রাজ্যের গালে চপেটাঘাত’। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেন, একটা সময় চিটফান্ড কাণ্ডে বন্ধ হয়ে চাওয়া চ্যানেলের কর্মীদের রিলিফ ফান্ড থেকে কখনও দশ হাজার, কুড়ি হাজার করে ভাতা দিয়েছিলেন। যা চূড়ান্ত অপরাধ। এভাবে টাকা দেওয়া যায় না। শুভেন্দু আরও বলেন, “কোর্ট আজ যে রায় দিয়েছে সেই রায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মানবেন কিনা সন্দেহ আছে। কারণ ওবিসি রিজার্ভেশন দিয়ে যে অর্ডার কোর্ট দিয়েছে, তার পরেও শিক্ষা দফতরের ভর্তির ওয়েবসাইটে দেখবেন অ্যাডমিশনের কাজ চলছে। আর কয়েকমাস পরই রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন। তার আগে প্রথমে ওবিসি বিল নিয়ে ধাক্কা, এবার চাকরিহারা শিক্ষাকর্মীদের ভাতা দেওয়া নিয়ে জোরালো ধাক্কা খেল রাজ্য সরকার। এমনিতেই ২৬ হাজার চাকরি বাতিল নিয়ে প্রবল অস্বস্তিতে শাসকদল। একটা আংশকে ভাতা দিয়ে মুখ বন্ধ রাখতে চেয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু তাও ধাক্কা খেল আদালতের রায়ে। ফলে ছাব্বিশের আগে প্রবল চাপে তৃণমূল। আর বিতর্ক বাড়িয়ে সেই চাপ আরও চাগিয়ে দিলেন কুণাল ঘোষ।












Discussion about this post