উত্তরবঙ্গের বন্যা দুর্গত এলাকায় ত্রাণ বিলি করতে গিয়ে আক্রান্ত বিজেপির দুই জনপ্রতিনিধি। যা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব হলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। খুব কম ক্ষেত্রেই তাঁকে এমনটা করতে দেখা যায়। পাল্টা জবাব দিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রীও। রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এই ফেসবুক পোস্ট কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে সিঁদুরে মেঘ।
একজন সাংসদ, অন্যজন বিধায়ক। আর দু’জনেই বিজেপি নেতা। দুর্যোগ-বিপর্যস্ত জলপাইগুড়ির নাগরাকাটার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন এবং প্রয়োজনীয় ত্রাণের ব্যবস্থা করতে গিয়েছিলেন তাঁরা। প্রথমজন মালদা উত্তরের বিজেপি সাংসদ খগেন মুর্মু এবং দ্বিতীয়জন শিলিগুড়ির বিজেপি বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ। সোমবার দুপুর ১টা নাগাদ তাঁদের উপর আক্রমণ করে বেশ কয়েকজন দুষ্কৃতি। ইটের ঘায়ে বিজেপি সাংসদ খগেন মুর্মুর মুখ থেকে গলগল করে রক্ত ঝরেছে। তাঁর গাড়ির একটি কাঁচও আস্ত নেই। অপরদিকে শঙ্কর ঘোষকে অবাধে ধাক্কা, চড়-ঘুষি মারা হয়েছে বলে একাধিক ভিডিওতে দেখা গিয়েছে। দুজনেই শিলিগুড়ির এক বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ঘটনার পর রাত পেরিয়ে ভোর হয়েছে, সকাল পেরিয়ে দুপুর হয়েছে। কিন্তু একজনকেও গ্রেফতার করতে পারেনি রাজ্য পুলিশ। কিন্তু এই ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক আঙিনায় উত্তাপ ছড়িয়েছে আগুনের মতোই। সোমবার রাতে নিজের এক্স হ্যান্ডেলে একটি পোস্ট করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি লেখেন, “যে ভাবে আমাদের দলের কার্যকর্তা তথা একজন সাংসদ ও অন্যজন বিধায়ক বাংলার বিপর্যস্ত এলাকায় দুর্গতদের সাহায্য করতে গিয়ে হামলার মুখে পড়েছেন, তা অত্যন্ত নিন্দনীয়।এই ঘটনা আসলে সে তৃণমূলের অসংবেদনশীলতা ও রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার করুণ পরিস্থিতির একটা উদাহরণ মাত্র”। শেষের এই বাক্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাঁদের বক্তব্য, ভারতের প্রধানমন্ত্রী এই মুহূর্তে গোটা বিশ্বেই অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন রাষ্ট্রপ্রধান। তাঁকে এক্স হ্যান্ডেলে ফলো করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে তামাম রাষ্ট্রপ্রধানরা। পশ্চিমবঙ্গের আইন শৃঙ্খলা নিয়ে নরেন্দ্র মোদির এ হেন পোস্ট গোটা বিশ্বের কাছে এই রাজ্যের স্বরূপ উন্মোচিত হয়ে গেল। এত দিন যা ছিল ভিতর ভিতর, এবার তা প্রকাশ্যে চলে এল। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর রাজ্যের আইন শৃঙ্খলার করুন অবস্থা তুলে ধরাটাও কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তিনি সচরাচর দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে এই ধরণের পোস্ট করেন না। তাই অনেকেই আশঙ্কা করছেন এবারে কি তবে পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারে কেন্দ্রীয় সরকার? অন্যদিকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগের পাল্টা দিতে সময় নেননি। তিনিও পাল্টা অভিযোগ করেছেন। ফেসবুক বার্তায় তিনি লেখেন, উত্তরবঙ্গের মানুষ যখন বিপর্যস্ত, সেই সময় দেশের প্রধানমন্ত্রী একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয় নিয়ে রাজনীতি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কোনও উপযুক্ত অনুসন্ধানের অপেক্ষা না করেই তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে দায় ঠেলতে মরিয়া হয়ে পড়েছেন তিনি। আমরাও ওই ঘটনার প্রকাশ্যে নিন্দা জানিয়েছি। আর সর্বোপরি এটা তো বুক চাপড়ানোর সময় নয়। বরং দুর্গতদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার সময়। পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী মনিপুর প্রসঙ্গ টেনে লেখেন, “যে প্রধানমন্ত্রী মণিপুর অশান্ত হওয়ার ৮৬৪ দিনের মাথায় গিয়েছিলেন, তাঁকে বাংলা নিয়ে এই সহসা উদ্বেগ মানায় না। আমি ওনাকে একটা কথা বলতে চাই, নির্বাচিত রাজ্য সরকারের কথা শুনুন, শুধু নিজের দলের লোকের নয়। আপনি ভারতেও প্রধানমন্ত্রী, শুধু বিজেপির নন”।
বাংলার রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ যদিও বলছেন মুখ্যমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীকে রাজনীতি না করে দুর্গতদের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলছেন, কিন্তু তিনি নিজেই কলকাতায় পুজো কার্নিভালে দাঁড়িয়ে কখনও ঢাক বাজালেন, কখনও আদিবাসীদের সঙ্গে নাচে পা মেলাচ্ছেন। ওদিকে তখন উত্তরবঙ্গে পাহাড় থেকে সমতল কার্যত বিপর্যস্ত। মৃত্যু হয়েছে বহু মানুষের।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য যে বিজেপি সাংসদ ও বিধায়ক আক্রান্ত হলেন, তাঁরা ত্রাণ সামগ্রী দিতে গিয়েছিল। তাঁদের রক্ষা করার দায়িত্ব ছিল রাজ্য পুলিশ ও প্রশাসনের। কিন্তু তাঁরা পুরোপুরি ব্যর্থ। এই ব্যর্থতা কিন্তু এই প্রথম নয়। এর আগেও বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জে পি নাড্ডার কনভয়ে হামলা হয়েছিল তখনও একইভাবে রাজ্য প্রশাসন কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। এই রাজ্যে যখন ইডি আধিকারিকরা আক্রান্ত হন, তখনও রাজ্য প্রশাসন কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। অপরদিকে জাতীয় নির্বাচন কমিশন যখন রাজ্যের তিনজন আধিকারিকের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়, তখনও রাজ্য সরকার তাতে আমল দেয়নি। ফলে পশ্চিমবঙ্গে যে আইনের শাসন নেই, সেটা নিয়ে বহুদিন ধরেই সরব বঙ্গ বিজেপির নেতারা। অনেকে এই রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসনের দাবিও জানিয়েছে। এই অবহেই নাগরাকাটায় বিজেপির দুই সাংসদ ও বিধায়ক আক্রান্ত হলেন তৃণমূলের আশ্রিত দুষ্কৃতিদের হাতে। বিজেপি নেতা তথা রাজ্যের বিরোধী দোlলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর অভিযোগ, আক্রমণকারীরা প্রত্যেকেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। তাঁর আরও অভিযোগ, এটি পরিকল্পিত আক্রমণ। তাই রাজ্য প্রশাসন কোনও ব্যবস্থা নেবে না। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ইঙ্গিতও সেই দিকে। সূত্রের খবর, ঘটনার রাতে অর্থাৎ সোমবার রাতেই রাজভবনের তরফে কড়া রিপোর্ট পৌঁছে গিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে। তারপরেই প্রধানমন্ত্রী ট্যুইট করেন। এমনটাও জানা যাচ্ছে, রাজভবনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সবরকম পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে। যদি এটা সত্যি হয়, তাহলে এই রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির প্রস্তুতি নিচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার। এটা বলাই বাহুল্য। এখন দেখার কোথাকার জল কোথায় গড়ায়।












Discussion about this post