১৯৮১ সালের ১৭ মে থেকে আজকের দিন পর্যন্ত শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেত্রী হিসেবে সভানেত্রী পদে রয়েছেন। গত বছরের পাঁচই অগাস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত এবং দেশ ছাড়ার পর থেকে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের দায়িত্ব কাকে দেওয়া যায় তা নিয়ে চিন্তায় রয়েছেন তিনি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তার অনুপস্থিতিতে কে বা কারা কীভাবে দলের হাল ধরবেন অথবা তাঁর উত্তরাধিকার কে হবেন তা নিয়েও ভাবনাচিন্তা করছেন আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নেত্রী। এমনকি তিনি এই কাজ শুরুও করে দিয়েছেন। ভারতে আশ্রয় নেওয়া আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা একান্তে বলছেন, গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে একটা লম্বা ইনিংসের লক্ষ্যে তিনি দলের অভ্যন্তরে আমূল পরিবর্তন আনতে চাইছেন। মনে করা হচ্ছে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের ‘রাহুল-প্রিয়াঙ্কা মডেল’ অনুসরণ করতে চাইছেন। অর্থাৎ, দলের উত্তরাধিকার হিসেবে নিজের ছেলে-মেয়েকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে চাইছেন।
অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, গত বছরের পাঁচই অগাস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সংগঠন যে কার্যত তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল, সেটার একটা বড় কারণ ছিল তিনি দলের কাউকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন না। অর্থাৎ একনায়কের মতো নিজের সিদ্ধান্তই চাপিয়ে দিতেন দলের অন্যান্য নেতা-নেত্রীদের মধ্যে। ফলে বাংলাদেশে যখন জুলাই বিপ্লব মাথাচারা দিয়ে উঠছে, এবং ক্রমশ সেই আন্দোলন বৃদ্ধি পাচ্ছিল, তখন হাসিনাকে বলা সত্বেও তিনি কারও কথা বিশ্বাস করেননি। এমনকি গোয়েন্দা রিপোর্টগুলিও অস্বীকার করেছিলেন। যখন বিষয়ের গুরুত্ব তিনি অনুধাবন করেছিলেন, তখন অনেকটাই দেরি হয়ে গিয়েছিল। গণঅভ্যুত্থানের পর হাসিনা এবং তাঁর দলের শতাধিক নেতা-নেত্রী দেশত্যাগ করার পর আওয়ামী লীগের সংগঠন যে কার্যত তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল। এর ওপর বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দলটির কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করে রেখেছে। হাসিনা দেশে থাকলে দলের হাল তিনি ফিরিয়ে দিতে পারতেন, এ কথা বলাই বাহুল্য, কিন্তু তিনি দেশের বাইরে। এই পরিস্থিতিতে তাঁকে কার্যত ভারত থেকেই আওয়ামী লীগের পুনর্গঠন করতে হচ্ছে।
বিভিন্ন সূত্র দাবি করছে, শেখ হাসিনা তার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ও কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল– এই দুজনকেই নির্দিষ্ট দায়িত্ব দিয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বে আনার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে ফেলেছেন। এমনকি দলের পুনর্গঠনে একটা ভূমিকা থাকবে শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববিরও। অর্থাৎ নতুন প্রজন্মকে তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আনতে চলেছেন, আর সেই নতুন প্রজন্ম পারিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে চান শেথ হাসিনা। যেমনটা ভারতের কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধি এখন দলের ব্যাটন তুলে দিয়েছেন ছেলে রাহুল ও মেয়ে প্রিয়াঙ্কার হাতে। অর্থাৎ কংগ্রেসের ‘মডেল’ অনুসরণ করেই শেখ হাসিনা এবার আওয়ামী লীগের পরবর্তী ধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে চান। বর্তমানে সজীব ওয়াজেদ জয় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করলেও আওয়ামী লীগের হয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দলীয় অবস্থান তুলে ধরছেন নিয়মিত। অনেকটা ‘দলের মুখপাত্র’ হিসেবে কাজ করছেন তিনি। অন্যদিকে, সায়মা ওয়াজেদ, যিনি আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আঞ্চলিক পরিচালক ছিলেন, এখন তার পদ থেকে অনির্দিষ্টকালীন ছুটিতে পাঠানোর পর সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হচ্ছেন। তাঁকে একটা বড় দায়িত্ব দিয়েছেন শেখ হাসিনা। অন্যদিকে শেখ হাসিনা বেশি ভরসা রাখছেন দলের তিনজন শীর্ষ নেতার ওপর, যারা প্রত্যেকেই আপাতত কলকাতায় আছেন। এরা হলেন বাংলাদেশের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক সংসদ সদস্য ও একদা প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বাহাউদ্দিন নাসিম এবং আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক এমপি জাহাঙ্গীর কবির নানক। অপরদিকে কাগজে-কলমে যিনি এখনও আওয়ামী লগের সাধারণ সম্পাদকের পদে আছেন, সেই ওবায়দুল কাদের দলের এই নতুন কাঠামোতে একেবারেই উপেক্ষিত বলে জানা যাচ্ছে। তবে নতুন আওয়ামী লীগে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবেন সজীব জয় এবং সায়মা ওয়াদেদ পুতুল।












Discussion about this post