২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য দিন হিসেবে লেখা থাকবে। তবে ইতিহাসই ঠিক করবে সেটা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে নাকি নির্লজ্জতার কালো কালিতে। আপাতত বাংলাদেশের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী সেটা স্বর্ণাক্ষরে লেখার বন্দোবস্ত করতে ইচ্ছুক। গত বছরের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে এক তথাকথিত গণ-অভ্যুত্থান সংগঠিত হয়েছিল, যার জেরে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তড়িঘড়ি দেশ ছেড়ে পালাতে হয়। এর তিনদিনের মাথায় একটি অন্তরবর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। বিদেশ থেকে যার মাথায় এসে বসেন প্ৰখ্যাত অর্থনীতিবিদ তথা বাংলাদেশের একমাত্র নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
বাকি উপদেষ্টারাও কেউ কেউ বিদেশী বা দৈত নাগরিক। এবং কয়েকজন আন্দোলনকারী ছাত্র নেতা এবং অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্তা। যাইহোক, এই তথাকথিত বিপ্লব, গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে মূল আন্দোলনকারী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা-সমন্বয়কদের গর্বের শেষ নেই। তাঁরা হয়তো জানেন, বা এতদিনে জেনে গিয়েছেন যে এই আন্দোলন ও সরকার পতনের এই কর্মকান্ড স্বতঃপ্রনোদিত কোনও ঘটনা ছিল না। বরং সেটা একটা উদ্দেশ্যপ্রনোদিত ঘটানো চক্রান্ত ছিল। মুহাম্মদ ইউনূস নিজেও তা বলে ফেলেছেন আর পরবর্তী সময়ে এই চক্রান্তের পর্দাফাঁস করেন স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যাইহোক, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে তো আর সত্যিটা বলা যাবে না, তাই জুলাই বিপ্লব থেকে জুলাই সনদ, ৫ আগস্ট স্মরণীয় করে রাখতে “গণ-অভ্যুত্থান” দিবস এবং ৮ আগস্ট যেদিন অন্তরবর্তীকালীন সরকার শপথ নিয়েছিল, সেদিন “নতুন বাংলাদেশ” দিবস পালনের নিদান দেওয়া হয়েছে সরকারিভাবে। সবমিলিয়ে নতুন বাংলাদেশে নতুন ভাবনা, নতুন চেতনা পুনরায় জাগ্রত করার প্রচেষ্টা। কিন্তু এই নতুন বাংলাদেশ আদৌ কি গর্বের, নাকি লজ্জার? এই প্রশ্ন নিয়েও চলছে কাঁটাছেঁড়া।
৫ আগস্ট সরকারি ছুটি ঘোষণা হয়েছিল আগেই। কারণ দিনটি উৎসবের, আনন্দের। কিন্তু সেটা কাদের জন্য? বাংলাদেশের আম নাগরিকদের কাছে, নাকি মুষ্টিমেয় কয়েকজনের জন্য আনন্দের? যারা ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছে কেবলমাত্র নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধি করতে। বর্তমান সরকারের প্রতিষ্ঠা দিবস অর্থাৎ মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার যা গত বছর ৮ অগস্ট শপথ নিয়েছিল। এবার ওই দিনটি ‘নতুন বাংলাদেশ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে ইউনূস প্রশাসন। ব্যাপারটা ঠিক নিজের ঢাক নিজে পেটানোর মতো। এখানেই শেষ নয়, গণ আন্দোলনের সময়ে রংপুরে পুলিশের গুলিতে আবু সঈদের নিহত হওয়ার দিন ১৬ জুলাইকে ‘শহিদ আবু সঈদ দিবস’ ঘোষণা করা হয়েছে। বুধবার এই বিজ্ঞপ্তিও জারি করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিল্শেষকদের অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন এই সবের যৌতিকতা নিয়ে। যে সরকার তীব্র আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে একটা সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তাঁদের এক বছর পর কেন ঢাক-ঢোল পিটিয়ে এত প্রচার করতে হবে? আসলে জুলাই মাস থেকে পরবর্তী ৩৬ দিন নানা অনুষ্ঠান ও কর্মসূচির মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই আনন্দ-উৎসব পালণ করবে। কর্মসূচির শেষ দিন অর্থাৎ, ৫ অগাস্ট দেশের ৬৪ জেলায় জুলাই বিপ্লবের শহিদদের স্মরণ, গত বছরের ওই দিনের ভিডিও প্রকাশ, স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা নিবেদন, ঢাকার মানিক মিঁয়া অ্যাভিনিউতে বিজয় সমাবেশ, শহিদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুসের সাক্ষাৎ ইত্যাদির কর্মসূচি রয়েছে।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, বিগত প্রায় এক বছরে ইউনূসের নেতৃত্বাধিন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার একটাও পূরণ হয়নি। দিন দিন এই সরকার ব্যর্থ প্রমানিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ক্রমশ অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলার অতলে তলিয়ে যাচ্ছে। মুহাম্মদ ইউনূস এবং তাঁর অন্যতম সহযোগীরা চাইছেন বাংলাদেশকে কট্টর ইসলামিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে। এর জন্য বাংলাদেশের সংবিধানকেই কবর দিয়ে নতুন সংবিধান রচনার কথা বলে আসছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তথা জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতারা। যার অন্যতম প্রমান হল সম্প্রতি ঢাকার খিলক্ষেত দুর্গামন্দিরটি ভেঙে দিল বাংলাদেশ প্রশাসন। রীতিমতো বুলডোজার দিয়ে মন্দিরটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় হিন্দু সমাজের মানুষজন মন্দিরটি ভাঙা আটকাতে বুলডোজারের সামনে শুয়েও পড়েছিলেন। কান্নায় ভেঙে পড়েন কয়েকশো মানুষ। কিন্তু পুলিশ ও সেনাবাহিনী তাদের সরিয়ে দিয়ে দুর্গামন্দির ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার বুকেই এমন নিন্দনীয় ঘটনা ঘটেছে। ভারত সরকারের নজর এড়ায়নি এই কাণ্ড। গোটা ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল।
উল্লেথ্য, ভারত সরকার বিগত দশ মাস ধরেই বাংলাদেশে ঘটে চলা ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর আক্রমণ ও অত্যাচার নিয়ে ক্রমাগত নিন্দা প্রকাশ করে চলেছে। এই ব্যাপারে বাংলাদেশ প্রশাসনকেও সচেতন হওয়ার আর্জি জানিয়ে আসছে। কিন্তু ইউনূসের সরকার সেই সব আর্জি কানেই তোলেনি। এখন তিনি ব্যস্ত তাঁর সরকারের বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠান করতে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ কি চাইছেন এই আনন্দ-উৎসবে অংশগ্রহন করতে? উত্তরটা হল না। কারণ, এখন বাংলাদেশে বেকারত্ব ও খিদের জ্বালা আগের থেকে বেশি। কলকারখানা বেশিরভাগই বন্ধ। বিদেশি মুদ্রা আসছে শুধুমাত্র রেমিট্যান্স থেকে। আর সরকার চলছে ঋণ নিয়ে। দেশীয় উৎপাদনের অন্যতম পোশাক শিল্পও ধুঁকছে। সবমিলিয়ে নতুন বাংলাদেশ কোনও মতেই গর্বের নয়, বরং লজ্জার।












Discussion about this post