সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বিজেপির কোনও লড়াই নেই। বঙ্গ বিজেপির নব নির্বাচিত সভাপতির মুখে এই কথা শুনে কার্যত চোখে শর্ষে ফুল দেখছেন বাংলার বহু রাজনৈতিক বিশ্লেষক। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে যে বিজেপি সম্পূর্ণ ভিন্ন রণকৌশল নিয়ে ময়দানে নামবে, তা বুঝিয়ে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এবার শমীক ভট্টাচার্য নতুন বঙ্গ সভাপতি হয়েই রাজ্যের সংখ্যালঘুদের উদ্দেশ্যে এক বড় বার্তা দিলেন। যা নিয়ে নতুন চর্চা শুরু হয়েছে।
ভারতীয় জনতা পার্টি তথা বিজেপির নতুন রাজ্য সভাপতি হিসেবে বৃহস্পতিবার দায়িত্ব নিলেন শমীক ভট্টাচার্য ৷ কলকাতার সায়েন্স সিটিতে বিজেপির তরফে আয়োজিত ‘রাজ্য সভাপতি নির্বাচন ও অভিনন্দন সমারোহ’ নামে এক অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে বঙ্গ বিজেপির ব্যাটন তুলে দেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয়মন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ ৷ যিনি এই বাংলার সভাপতি নির্বাচনে দলীয় পর্যবেক্ষক ছিলেন। রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন বড় জোর আর সাত-আট মাস বাকি। ফলে বঙ্গ বিজেপির নতুন সভাপতির কাছে এটা “টাফ টাইম” বা শুরুতেই অগ্নীপরীক্ষা বলে মনে করছেন রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহল। অনেকেই মুখিয়ে ছিলেন, সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর শমীক ভট্টাচার্য কি বার্তা দেন, বা বিজেপি কর্মীদের কোনও নতুন দিশা দেখান কিনা সেটা শোনার জন্য। তিনি বললেন, যা শুনে অনেকেই চোখ কপালে তুললেন। কারণ, সংখ্যালঘুদের উদ্দেশ্যে তাঁর বার্তা একেবারেই ভিন্ন। সকলকে চমকে দিয়ে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা তথা বিজেপি বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারীর ‘উগ্র’ হিন্দুত্বের উলটো সুর গেয়ে নব নির্বাচিত বঙ্গ সভাপতি ‘সবকা সাথ’ বার্তা দিলেন। বললেন ও।
বাংলার গেরুয়া সংগঠনের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে শমীকের প্রথম চ্যালেঞ্জই হল আসন্ন নির্বাচনে শাসকদল তৃণমূলকে হারানো। অন্তত রাজ্য সভাপতি হিসেবে প্রথম ভাষণে তিনি সে কথাই উল্লেখ করলেন। তাঁর কথায়, এতদিন ধরে বিজেপি যতটা রাস্তা পেরিয়েছে, সেই রাস্তা কিন্তু মোটেও মসৃণ ছিল না। আমাদের কর্মীদের উপর অনেক অত্যাচার হয়েছে, মিথ্যে মামলা দেওয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও বিজেপি কর্মীরা সাহসের সঙ্গে লড়াই করেছেন। তবে তিনি মনে করেন, আগামী বছর বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের বিসর্জন অবশ্যম্ভাবী৷ এই নির্বাচনেই বাংলার মানুষ তৃণমূলকে পরপারে পাঠিয়ে দেবে৷
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল সংখ্যালঘুদের উদ্দেশ্যে দেওয়া তাঁর বার্তা। বাংলার রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহল মনে করছেন, তৃণমূলের শক্তি এখন সংখ্যালঘু ভোটব্যাংক ৷ যা শুধুমাত্র তাঁদেরই রয়েছে। ফলে বিধানসভা ভিত্তিক ফলাফলে সংখ্যালঘুদের ভোটের জোরেই শাসকদল জিতে যায়। এমন অনেক আসন আছে, যেখানে প্রবল লড়াই করলেও শেষ পর্যন্ত অল্প ভোটে হাতছাড়া করতে হয়েছে বিজেপিকে। এবার সেই সংখ্যালঘু ভোটব্যাংকেই ফাটল ধরাতে মরিয়া বিজেপি। নতুন রাজ্য সভাপতি হিসেবে শমীক ভট্টাচার্য বলেন, গোটা বাংলাকে খোলা বাজার বানিয়ে দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূল যাদের হাতে তরবারি ধরিয়েছে, সেই তরবারি সরিয়ে কলম ধরিয়ে দিতে চায় বিজেপি। তিনি বর্তমানে সংখ্যালঘুদের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করিয়ে স্মরণ করিয়ে দেন, সংখ্যালঘুদের একাংশকে দুষ্কৃতী করে দিয়েছে তৃণমূল৷ তার জেরে যখনই গোলমাল হচ্ছে, তখনই অনেক সংখ্যালঘুকে প্রাণও হারাতে হচ্ছে৷ এই পরিস্থিতি বদলের ডাক দেন শমীক ভট্টাচার্য৷
বাংলার রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, এটা শমীক ভট্টাচার্যের মাস্টারস্ট্রোক। শুভেন্দু অধিকারী শুধুই উগ্র হিন্দুত্ববাদের প্রচার করে চলেছেন। যা সংখ্যালঘুদের তৃণমূলের দিকে ঝুঁকতে সাহায্য করছে। কিন্তু বাংলায় এটা করে বিজেপি খুব একটা লাভবান হবে না। মূল এজেন্ডা থেকে কিছুটা সরে এসে বিজেপিকে সংখ্যালঘুদেরও কাছে টানার উপায় খুঁজতে হতো। যা করার চেষ্টা করলেন শমীক ভট্টাচার্য। কালীগঞ্জ বিধানসভা উপনির্বাচনের ফল ঘোষণার দিন এক সংখ্যালঘু শিশুকন্যার খুন হওয়ার পর সংখ্যালঘুদের মধ্যেও একটা আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। সেটাই স্মরণ করিয়ে শমীক ডাক দিলেন, উন্নতির পথ অবলম্বনের। তাঁর বার্তা, সবকা সাথ, সবকা বিকাশের। এবার এই প্রচারই যদি বিজেপি মূল মন্ত্র করে নেয়, তাহলে আগামী বিধানসভায় তৃণমূলের জন্য দুঃখ বরাদ্দ হয়ে যাবে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।












Discussion about this post