একুশে জুলাইয়ের মঞ্চ থেকে সংখ্যালঘু ইস্যুতে শান দিয়ে তৃণমূল নেত্রী সরব হয়েছিলেন ভিন রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকদের আটক করা এবং বাংলাভাষীদের বাংলাদেশি বলে দেগে দেওয়ার মতো বিষয়ে। ছাব্বিশের ভোটের আগে যখন এটা তৃণমূলের মাস্টারস্ট্রোক বলে ধরে নেওয়া হচ্ছিল, তখনই গলার কাঁটা হয়ে সামনে এলেন তৃণমুলেরই বিধায়ক হুমায়ুন কবীর। তিনি রাজনৈতিক দল গড়বেন, তাহলে কি সংখ্যালঘু ভোট ভাগ হয়ে যাবে?
এক বছর আগেই নতুন রাজনৈতিক দল গড়ার কথা জানিয়েছিলেন তৃণমূল বিধায়ক হুমায়ুন কবীর। এক বছর বাদে ফের একবার তিনি নতুন রাজনৈতিক দল ঘোষণা করার দাবি করলেন। তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নেত্রীকে সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে তিনি আগামী ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। মুর্শিদাবাদের রেজিনগরের বিধায়কের এহেন হুমকি, শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসকে যথেষ্টই চাপে ফেলেছে, এ কথা বলাই বাহুল্য। কিন্তু কেন নতুন রাজনৈতিক দল গড়তে চাইছেন সংখ্যালঘু এই নেতা?
২০১৫ সালে দল বিরোধী কার্যকলাপের জন্য হুমায়ুন কবীরকে ৬ বছরের জন্য বহিষ্কার করেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। ২০১৬ সালের নির্বাচনে তিনি টেবিল চিহ্নে নির্দল প্রার্থী হিসেবে ভোটে লড়েন মুর্শিদাবাদের রেজিনগর আসন থেকে। কিন্তু হেরে যান। ২০১৮ সালে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন, এবং বিজেপির টিকিটে জঙ্গিপুর থেকে লড়াই করেন ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে। সেখানেও হেরে যান। এরপরে বহিষ্কারের ছয় বছর পূর্ণ করার পর তিনি আবার তৃণমূলে ফেরেন। তাঁকে মুর্শিদাবাদের ভরতপুর বিধানসভা উপনির্বাচনে দাঁড় করান তৃণমূল নেত্রী, এবং জিতে বিধায়ক হন। অর্থাৎ বিতর্ক চির সঙ্গী হুমায়ুন কবীরের। এক বছর আগেও তিনি মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি মন্তব্যে অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। কারণ তৃণমূল তাঁকে শোকজ করেছিল। ক্ষুব্ধ হুমায়ুন সেবারও বলেছিলেন, নতুন দল গড়ে ভোটে লড়বো। সেবার তাঁর বক্তব্য ছিল, ২৬-এর নির্বাচনে নিশ্চই আমাকে তৃণমূল টিকিট দেবে না। আমি সেটা প্রত্যাশাও করি না। আমি নিজেই দল গড়ে টিকিট বিলি করবো।
এক বছর পরও রেজিনগরের বিধায়কের রাগ কমেনি। তিনি ফের ক্ষুব্ধ তৃণমূলের প্রথমসারির নেতাদের বিরুদ্ধে। এবারও তাঁর ঘোষণা, খুব শীঘ্রই নতুন দল গড়ছেন তিনি। আর মুর্শিদাবাদ, মালদা ও নদিয়া জেলার ৫০টি আসনে তিনি প্রার্থী দেবেন। বলা বাহুল্য এই ৫০টি আসন অবশ্যই সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকা। বিক্ষুব্ধ তৃণমূল বিধায়কের বিস্ফোরক দাবি, ১৫ অগস্ট পর্যন্ত দেখবেন, এরপর ‘অলআউট’ লড়াইয়ে নামবেন। পাশাপাশি তিনি এও জানান, তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি তাঁর কোনও রাগ বা অভিমান নেই। কিন্তু মুর্শিদাবাদ জেলা নেতৃত্ব এবং তৃণমূলের কয়েকজন রাজ্য নেতাদের বিরুদ্ধেই তাঁর মূল ক্ষোভ।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, তাঁর নতুন দল ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে পথে নামবে। আর এই দলের কর্মকাণ্ড আপাতত তাঁর নিজের জেলা মুর্শিদাবাদ ছাড়াও মালদা, দক্ষিণ দিনাজপুর ও নদিয়াতে ছড়িয়ে থাকবে। হুমায়ুনের দাবি, আপাতত ৫০ থেকে ৫২টি আসনে লড়ার চিন্তাভাবনা হয়েছে।
রাজনৈতিক মহলের বিশ্লেষণ, রেজিনগর, ভরতপুর বিধানসভা কেন্দ্র সংখ্যালঘু অধ্যুষিত। নিজের এলাকায় বেশ শক্ত খুঁটি রয়েছে হুমায়ুনের। তাই তাঁর সম্ভাব্য দলত্যাগ তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য যথেষ্ট হুমকি। যদি এই সমস্ত এলাকার সংখ্যালঘু ভোট হুময়ুনের দিকে ঝোঁকে, তাহলে তা গুরুত্বপূর্ণ জেলাগুলিতে তৃণমূল কংগ্রেসের ফলাফলে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। আর বঙ্গ রাজনীতিতে পোড় খাওয়া এই সংখ্যালঘু নেতা যখন জোর গলায় বলছেন, ৫০-৫২ আসনে প্রার্থী দিতে পারবেন, তাহলে বুঝে নিতে হবে তিনি হোমওয়ার্ক করে বসে আছেন। এটাই ভাবাচ্ছে শাসকদলকে। যদিও তৃণমূল নেতা তথা কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম তা মানতে নারাজ। তিনি হুমায়ুন কবীরের হুঁশিয়ারিকে পাত্তা দিতেই নারাজ।
রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের মাত্র এক বছর বাকি রয়েছে। ফলে বিক্ষুব্ধ সংখ্যালঘু বিধায়ক হুমায়ুনের এই পদক্ষেপ নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। চাপে পড়েছে শাসকদলও। কিন্তু ওয়াকিবহাল মহল বলছে, হুমায়ুন কবীর এর আগেও বহুবার নতুন দল গড়ার হুমকি দিয়েছিলেন। এখন দেখার ছাব্বিশের ভোটের আগে তিনি কি করেন।












Discussion about this post