ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সমীক্ষা বা স্পেশ্যাল ইনটেনসিভ রিভিশন নিয়ে ক্রমেই সুর চড়াচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার তিনি বোলপুরে এক প্রশাসনিক বৈঠক করেন। সেখানে তিনি নির্বাচন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিএলও-দের বার্তা দিলেন, ‘আপনারা স্টেট গভর্নমেন্টের চাকরি করেন, অযথা কাউকে হেনস্থা করবেন না’! প্রশ্ন উঠছে, এটা বার্তা না হুমকি?
বিহারে বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সমীক্ষা বা স্পেশ্যাল ইনটেনসিভ রিভিশন করছে নির্বাচন কমিশন। এই গোটা প্রক্রিয়া নিয়েই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টেও চলছে মামলা। তবে এখনও পর্যন্ত এই প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ বা স্থগিতাদেশ দেয়নি সর্বোচ্চ আদালত। জানা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গেও একই প্রক্রিয়া শুরু করতে চলেছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন। যা নিয়ে প্রবল আতঙ্কিত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়। সোমবার বীরভূমের বোলপুরে এক প্রশাসনিক সভা করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানেই তিনি এক বিস্ফোরক দাবি করেন। তাঁর দাবি, পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রায় এক হাজার কর্মীকে দিল্লিতে নিয়ে গিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আমি জানতামই না। এরপরেই কার্যত হুমকির সুরে তিনি রাজ্যের বুথ স্তরের আধিকারিক বা বিএলও-দের উদ্দেশ্যে বলেন, “ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণা হওয়ার পর দায়িত্ব নেয় নির্বাচন কমিশন। তার আগে এবং পরে রাজ্য সরকারের হাতেই প্রশাসনিক দায়িত্ব থাকে। আপনারা রাজ্য সরকারের চাকরি করেন। কোনও মানুষকে অযথা হেনস্থা করবেন না।”
এই ব্যাপারে জেলাশাসকদের ‘চোখ-কান খুলে রাখার’ পরামর্শ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। আসলে বিহারের মতো এই রাজ্যেও ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধনী করতে চলেছে নির্বাচন কমিশন। যদিও তাঁরা এখনও কোনও বিজ্ঞপ্তি জারি করেনি। তবুও এই রাজ্যে এসআইআর শুরু হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তৃণমূল নেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী। তাই তিনি আগাম প্রস্তুতি নিতে চাইছেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের কি হুমকি দিলেন? প্রসঙ্গত, নির্বাচন কমিশনের তালিকা অনুযায়ী, শিক্ষক, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী, পঞ্চায়েত সচিব, পোস্টম্যান, স্বাস্থ্যকর্মী, চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক, বিএলও তালিকায় পড়েন। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর ইতিমধ্যেই কলকাতার নজরুল মঞ্চে বিএলও-দের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেছে। জেলা ধরে ধরে তাঁদের প্রশিক্ষণ চলছে। বিএলও-দের দাবি, এসআইআর নিয়েও তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তার মধ্যে মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্য যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটা বড় অংশ বলছেন, যে হাজার জনের দিল্লি যাওয়ার কথা বলছেন, তা রাজ্য সরকার জানবে না তা কখনওই হতে পারে না। অযথা জলঘোলা করতেই মুখ্যমন্ত্রী এই কথা বলেছেন। এদিন বোলপুরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ইলেকশন কমিশন যখন ভোটের নির্ঘণ্টের নোটিফিকেশন জারি করে, তখন থেকে এটা ইলেকশন কমিশনের আওতায় চলে যায়। তার আগে রাজ্য সরকার। আবার ভোটের পরেও রাজ্য সরকার।’
মুখ্যন্ত্রী আসলে সরকারি আধিকারিকদের প্রশিক্ষণের বিষয়েই এই দাবি করছেন। কিন্তু বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, জাতীয় নির্বাচন কমিশন তো দেশের অন্যতম সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তাঁরা যদি কোনও স্পেশাল ড্রাইভ করতে চান তখন সেটা করতেই পারেন। ২০০২ সালেও গোটা ভারতে এসআইআর হয়েছিল। তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী আসনে ছিলেন, তাই তিনি স্বাগত জানিয়েছিলেন। আজ তিনি সরকারে বসে কেন এর বিরোধিতা করছেন? বিশ্লেষকদের দাবি, পশ্চিমবঙ্গ তো আর ভারতের বাইরে নয়, তাই কেন্দ্রীয় আইন, কেন্দ্রীয় সংস্থাকে মানবো না একটা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে তিনি এই কথাগুলি বলতে পারেন না। রাজ্য সরাকরি কর্মী হলেও নির্বাচন কমিশনের হয়ে এই বিএলওরাই ভোটার তালিকার প্রাথমিক সার্ভে করেন। প্রয়োজনীয় সংশোধন করেন। এসআইআর আবহে তাদের ভূমিকা অনেকটাই গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে দাঁড়িয়ে তাঁদের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রীর এই বার্তা যথেষ্টই তাৎপর্যপূর্ণ। বিজেপির মুখপাত্র অমিত মালব্য মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করতে দেরি করেননি। তিনি এক্স হ্যান্ডলে সেই বক্তব্যের ভিডিও ফুটেজ তুলে ধরে লেথেন, মমতা এখন সরাসরি থ্রেট করা শুরু করেছেন। তিনি জানেন, ভুয়ো ভোট ছাড়া জেতা সম্ভব নয়।












Discussion about this post