মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে মানবিক করিডোর দেওয়া নিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এখন তুমুল চর্চা চলছে। বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলিতে যা খবর আসছে তাতে বিভ্রান্ত হওয়া ছাড়া উপায় নেই। কারণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনা কর্মকর্তা জোয়েল পি ভোয়েল প্রথমে এসে সাক্ষাৎ করেছিলেন বাংলাদেশের সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামানের সঙ্গে। এরপর বেশ কয়েকজন মার্কিন সরকারি কর্তা দেখা করেন ইউনূস প্রশাসনের সঙ্গে। জানা যাচ্ছে, মার্কিন সেনা এবং সরকারি কর্তাদের ঢাকায় নিয়ে আসার ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহন করেছেন বাংলাদেশের সদ্য নিযুক্ত জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন মার্কিন নাগরিককে যখন দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদে বসানো হয়েছিল, তখনই বোঝা গিয়েছিল মুহাম্মদ ইউনূসের কোনও গোপন উদ্দেশ্য রয়েছে। এবার পরিস্কার হচ্ছে, রোহিঙ্গা ইস্যুকে সামনে রেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশে একটা বেস স্টেশন তৈরি করতে দেওয়ার সুযোগ করে দিতেই খলিলুর রহমানকে ব্যবহার করা হয়েছে। সেই সঙ্গে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে আরাকান আর্মি ও অন্যান্য বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিকে সহায়তা করার নামে তাঁদের অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করারও পরিকল্পনা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। আর এর জন্য প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশের মাটি ব্যবহারের অনুমতিও দিয়েছে ইউনূস সরকার। কিন্তু সেনাবাহিনীর তরফে এটা নিয়ে এখনও কোনও প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠছে, তবে কি সেনাবাহিনী এই করিডোর নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত?
সূত্রের খবর, বাংলাদেশের সেনাপ্রধান কোনও মতেই চাইছেন না বাংলাদেশের মাটিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাঁদের বেস স্টেশন তৈরি করুক। কিন্তু তাঁকে আপত্তি না শুনে হোক বা তাঁকে অন্ধকারে রেখেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মুহাম্মদ ইউনূস। আসলে জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের সঙ্গে কোনও ভাবেই বনিবনা হচ্ছে না মুহাম্মদ ইউনূসের। সেনাপ্রধান প্রথম থেকেই মেনে নিতে পারেননি ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা পদে আসুক। যা স্বীকার করে নেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ ও সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা সজীব মাহমুদ ভূঁইয়া। তাঁদের খোলাখুলি স্বীকারক্তিতে বাংলাদেশে কার্যত ঝড় বয়ে গিয়েছিল। সেনাপ্রধান পরপর কয়েকদিন ধরে নানা বৈঠক করেন। সেই সময় মনে করা হয়েছিল জেনারেল ওয়াকার কোনও বড় পদক্ষেপ নিতে চলেছেন। কিন্তু কার্য ক্ষেত্রে দেখা গেল, সেনাপ্রধানের ক্ষমতা খর্ব করতে এবং সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব সরকারের হাতে রাখতে খলিলুর রহমানকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা করা হল। যিনি রোহিঙ্গা বিষয়ক বিশেষ পরামর্শদাতা ছিলেন। খলিলুর রহমান আদতে মার্কিন নাগরিক এবং সে দেশে তাঁরা যথেষ্ট প্রভাব প্রতিপত্তি রয়েছে। ৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশের বর্তমান যা পরিস্থিতি তাতে এখনও সেনাবাহিনী একটা বড় ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে দেশের আইন-শৃঙ্খলা মোকাবিলা করতে সেনাকে এখনও রাস্তায় থাকতে হচ্ছে। অন্যদিকে মিয়ানমারের দিকে সীমান্ত যখন আরাকান আর্মির দখলে রয়েছে, তখন সেটা বাংলাদেশের জন্য একটা বড় হুমকি হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর প্রধানকেই অজ্ঞাতে রেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে চট্টগ্রামের কক্সবাজারে বেস স্টেশন তৈরির অনুমতি দিয়ে দেওয়া হল।
যেটা জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশের সেনার একাংশ ইউনূস সরকারের সঙ্গেই রয়েছেন। তাঁরা চাইছেন যুক্তরাষ্ট্রকে রাখাইন করিডোর করতে দেওয়া হোক। অন্যদিতে জেনারেল ওয়াকার-সহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ সেনাকর্তা সেটা চাইছেন না। রাখাইন করিডোরের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে কার্যত দুই ভাগ হয়ে গিয়েছে। এই অন্তর্দ্বন্দ্বের মধ্যে এই বিষয়ে সেনাবাহিনীর তরফে কোনও বিবৃতি দেওয়া হয়নি বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। অপরদিকে খলিলুর রহমান দাবি করছেন, কে কি বলল যায় আসে না, আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হবে।
ফলে বোঝাই যাচ্ছে, রাখাইন করিডোর নিয়ে বাংলাদেশ জুড়ে যতই বিতর্ক হোক, সেনাবাহিনীকে আড়াআড়ি ভেঙে দেওয়ার চক্রান্ত হোক। মুহাম্মদ ইউনূস সরকার নিজের অবস্থানে অনড়। অপরদিকে বসে নেই জেনারেল ওয়াকারও। তিনিও ভিতর ভিতর প্রস্তুতি চালাচ্ছেন। একদিকে যখন মার্কিন কর্তারা ঢাকায় এসে মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন, সেই সময় আচমকা রাশিয়া সফরে গিয়েছিলেন জেনারেল ওয়াকা। এখন জানা যাচ্ছে, কাতার সফরে গিয়ে তিনি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল অথবা তাঁর বিশেষ প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করে এসেছেন। অর্থাৎ, বাংলাদেশে কবে কি হবে, সেটা কেউ বলতে পারছেন না। তবে বড় কিছু হতেই পারে যে কোনও মুহূর্তে।












Discussion about this post