আর জি কর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্তব্যরত মহিলা চিকিৎসকের নাম প্রকাশ্যে বলে দিয়েছিলেন কলকাতার প্রাক্তন নগরপাল বিনীত গোয়েল। যা নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছিলেন এক আইনজীবী। হাইকোর্টের বিচারপতি রাজা শেখর মান্থা ও বিচারপতি অজয় গুপ্তের ডিভিশন বেঞ্চে ওঠে মামলাটি। তাঁর বক্তব্য, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মোতাবেক নির্যাতিতার নাম প্রকাশ্যে আনা ফৌজদারি অপরাধ। সে কারণে উপযুক্ত শাস্তি পাওয়া উচিত কলকাতা পুলিশের প্রাক্তন নগরপাল বিনীত গোয়েলের। কলকাতা হাইকোর্টে এই মামলার শুনানিতে বিনীতের আইনজীবী সন্দীপন গঙ্গোপাধ্যায় জানান, তাঁর মক্কেল লিখিত ভাবে ক্ষমা চাইতে প্রস্তুত। বৃহস্পতিবার শুনানিতে বিনীতের আইনজীবী জানান, আরজি করের ঘটনা খুবই মর্মান্তিক এবং বেদনাদায়ক। গত ১০ অগস্ট নির্যাতিতার নাম বিনীতের মুখ ফস্কে বেরিয়ে যায়। অনিচ্ছাকৃত ভাবেই তা হয়েছে বলে জানান তিনি। অবশেষে আর জি করের নির্যাতিতার নাম প্রকাশের জন্য আদালতের কাছে ক্ষমা চেয়ে চিঠি দিলেন কলকাতার প্রাক্তন নগরপাল বিনীত গোয়েল। এরপর বিচারপতি রাজাশেখর মান্থা এবং বিচারপতি অজয়কুমার গুপ্তের ডিভিশন বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, যেহেতু চিঠি লিখে ক্ষমা চেয়েছেন কলকাতার নগরপাল, তাই মামলাটি এখানেই বন্ধ হওয়া উচিত। পাশাপাশি বিষয়টি নিয়ে আর জটিলতা বৃদ্ধি করে লাভ নেই বলেই মত দিয়েছে উচ্চ আদালত।
অন্যদিকে আর জি কর হাসপাতালে ধর্ষণ-খুনের ঘটনায় নির্যাতিতার পরিবার আরও এক বিস্ফোরক প্রশ্ন তুলেছেন কলকাতার প্রাক্তন নগরপাল সম্পর্কে। তাঁদের দাবি, বুধবার শিয়ালদহ আদালতে কলকাতার প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়েলের সঙ্গে সিবিআইয়ের শীর্ষকর্তা সম্পৎ মীনার সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলেন আরজি করে ধর্ষণ-খুনের ঘটনায় নির্যাতিতার পরিবার। শিয়ালদা আদালতে নির্যাতিতার পরিবারের আইনজীবী দুই আইপিএস অফিসারের যোগাযোগের প্রসঙ্গ তোলেন। তাঁর দাবি, বিনীত এবং সম্পৎ একই ব্যাচের আইপিএস। তাই তাঁদের মধ্যে যোগাযোগ রয়েছে। সেই কারণে বিনীতের বিরুদ্ধে সিবিআই কোনও পদক্ষেপ করবে না, এমনকি সঠিক ভাবে তদন্তও করছে না সিবিআই। উল্লেখ্য, বুধবারই শিয়ালদা আদালতে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে তরুণী চিকিৎসক ধর্ষণ ও খুনের মামলায় ষষ্ঠ স্ট্যাটাস রিপোর্ট জমা দিয়েছে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই। এই রিপোর্ট জমা পড়ার পরে ফের ক্ষোভ উগরে দেন নির্যাতিতার পরিবারের আইনজীবী ফিরোজ এডুলজি। যদিও এই দাবি অস্বীকার করেছে সিবিআই। আদালতে সিবিআইয়ের আইনজীবী এপ্রসঙ্গে বলেন, ‘ব্যাচমেট হওয়া অপরাধ নয়। আমরা সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখেছি। সমস্ত সাক্ষীর বয়ান নিয়েছি। তাছাড়া বিনীতের বিরুদ্ধে অপরাধে যুক্ত থাকার কোনও প্রমাণ মেলেনি।
ওয়াকিবহাল মহলের অভিমত, এর আগেও তৎকালীন কলকাতার নগরপাল বিনীত গোয়েলের বিরুদ্ধে আর জি কর কাণ্ড ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। এমনকি তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও প্রকাশ্যে ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছিলেন আর জি কর হাসপাতালে হামলার রাতে। ওই ঘটনার সময়ে কলকাতার পুলিশ কমিশনার ছিলেন বিনীত গোয়েল। ফলে অভিষেকের লক্ষ্য যে তিনিই ছিলেন সেটা স্পষ্ট। আন্দোলনরত জুনিয়র ডাক্তারেরা সেই সময়ে তাঁর ইস্তফার দাবিও জানিয়েছিলেন। এমনকি তাঁর সঙ্গে বৈঠকে গিয়ে তাঁকে একটি প্রতিকী শিঁড়দাঁড়াও দিয়ে আসেন জুনিয়র ডাক্তাররা। বিতর্ক বাড়তে থাকায় অস্বস্তিতে পড়ে শাসকদল। এরপরই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিনীতকে পুলিশ কমিশনারের পদ থেকে সরিয়ে দেন। কিন্তু তার পরেও বিতর্ক থামেনি। এবার নির্যাতিতার আইনজীবী যে অভিযোগ তুললেন, সেটা নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজ্য রাজনীতিতে চর্চা শুরু হয়েছে। নির্যাতিতার আইনজীবী ফিরোজ় এডুলজি এই মামলার তদন্তকারী অফিসারের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। টেনেছেন উত্তরপ্রদেশের হাথরস কাণ্ডের প্রসঙ্গও। ঘটনাচক্রে আরজি করের ঘটনায় সিবিআইয়ের যে তদন্তকারী অফিসার রয়েছেন, তিনিই ছিলেন হাথরসের ঘটনার তদন্তে। উত্তরপ্রদেশের ওই ঘটনায় তিন জন অভিযুক্ত খালাস পান এবং এক জন দোষী সাব্যস্ত হন। আর জি করের ঘটনাতেও একমাত্র সঞ্জয় রায় ছাড়া কাউকে দোষী প্রমানিত করতে পারেনি সিবিআই। এরমধ্যেই ব্যাচমেট প্রসঙ্গ তুলে সিবিআই তদন্তের গতিপ্রকৃতি নিয়ে রীতিমতো প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিলেন নির্যাতিতার আইনজীবী।











Discussion about this post