“ আজকে অনেক রূঢ় রৌদ্র ঘুরে প্রাণ / পৃথিবীর মানুষকে মানুষের মতো / ভালোবাসা দিতে গিয়ে তবু / দেখেছি আমারি হাতে হয়তো নিহত / ভাই বোন বন্ধু পরিজন প’ড়ে আছে;/পৃথিবীর গভীর গভীরতম অসুখ এখন ; …. ”
আক্ষরিক অর্থেই পৃথিবীতে গভীরতম অসুখ। এক গভীরতম অসুখ অজগর সাপের মতো পৃথিবীকে জড়িয়ে ধরেছে। সেই অসুখে অসুখী বাংলাদেশও। পরিস্থিতি কিন্তু এতটা উগ্র ছিল না। মাত্র দেড় বছরের মধ্যে একটি দেশের ছবি সম্পূর্ণ বদলে গেল। হিংসা আর ঘৃণার আগুনে জ্বলছে বাংলাদেশ। সেই আগুনে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সে দেশে বসবাসকারী সংখ্যালঘুরা। পিটিয়ে মেরে দেহ জ্বালিয়ে দেওয়ার মতো হা়ড় হিম করার ঘটনার সাক্ষী বাংলাদেশ। সরকারের দায়িত্বে যিনি আছেন, তিনি সেই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পরিবর্তে তাতে আরও ঘি ঢালছেন। অগ্নিশিখা ক্রমেই চওড়া হচ্ছে। এই অবস্থায় আগামী ১২ তারিখ সে দেশে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে নির্বাচন।
যদিও এই নির্বাচন হবে কি না, তা নিয়ে একটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নির্বাচন বানচাল করে দিতে একটি গোষ্ঠী রীতিমতো সক্রিয়। কোনও কোনও সূত্রে বলা হয়েছে, ওই গোষ্ঠীর লক্ষ্য হল ভোটের আগে বাংলাদেশের পরিস্থিতি রীতিমতো ভয়াবহ করে তোলা যাতে নির্বাচন স্থগিত করে দিতে হয়। তদারকি সরকারও চাইছে না নির্বাচন। ইউনূস ভীষণভাবে চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিলেন যাতে নির্বাচন না হয়। কিন্তু ভারত এবং আন্তর্জাতিকমহলের চাপের কাছে নতিস্বীকার করে তিনি বাধ্য হয়ে ভোট ঘোষণা করেন। দেশে গণতন্ত্র ফিরুক, ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক, সেটা তিনি চাইছেন না। তিনি চাইছেন দেশে অশান্তি বিরাজ করুক। তাতে সব থেকে বেশি লাভবান তিনিই হবেন। বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে মূলত দুটি প্রশ্ন ঘোরাঘুরি করছে। প্রথমত ১২ তারিখ আদৌ নির্বাচন হবে? দ্বিতীয় প্রশ্ন নির্বাচন পরবর্তী হিংসার বলি কারা হবেন?
এই খবর যেদিন লেখা হচ্ছে, সেই দিন বাংলাদেশের কুমিল্লায় সংখ্যালঘু হিন্দু মধু চন্দ্র শীল নামে এক ব্যক্তিকে খুন করা হয়। জমি নিয়ে বিবাদের জেরেই এই খুন বলে পুলিশ জানিয়েছে। খুনের ঘটনা ঘটেছে নরসিংদীতেও। অভিযোগ উঠেছে হিন্দু যুবককে পুড়িয়ে মারার। ২৩ বছরের ওই হিন্দু যুবকের নাম চঞ্চল ভৌমিক। সে একটি গ্যারেজে কাজ করত। চঞ্চল ভৌমিক নরসিংদী পুলিশ লাইনের কাছে মসজিদ মার্কেট এলাকার একটি গ্যারেজে কাজ করতেন এবং নিয়মিত সেখানেই ঘুমাতেন।গভীররাতেএকজনঅজ্ঞাতব্যক্তিরাগ্যারেজেরশাটারবন্ধকরে, পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন।
নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চঞ্চলের কারও সঙ্গে ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল না। গ্যারেজ মালিক এবং স্থানীয়রা মনে করছেন, হত্যার পেছনে ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য নয়, সম্ভবত ধর্মীয় উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তবে এখনও পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে হত্যার উদ্দেশ্য নিশ্চিত করেনি। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর লাগাতার আক্রমণের ঘটনা ঘটছে। গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে শরীয়তপুর জেলায় ৫০ বছর বয়সী ব্যবসায়ী খোকন দাসকেও জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল। ক্রমবর্ধমান সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে নিন্দা ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে, এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার প্রশ্ন নতুন করে ইউনূসের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি একের পর এক সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর চলমান হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে অবিলম্বে এসব হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বিচারের মধ্য দিয়ে খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন।
ইতিমধ্যে ভারত সরকারের তরফে বাংলাদেশের সব কূটনৈতিক মিশনে বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে। বলা হয়েছে, নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি সে দেশে বসবাসকারী সংখ্যালঘুদের নিশানা করা হবে। বিশেষ করে হিন্দুদের। অতীতের যে কোনও সময়ের চাইতে অনেক বেশি অনিরাপদ অবস্থায় তারা বসবাস করছেন। পরিস্থিতি আগামীদিনে আরও ভয়ংকর হতে পারে বলে সব মহল থেকেই আশঙ্কা করা হচ্ছে। পুলিশের তরফ থেকে তদারকি সরকারের কাছে একটি রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। সেই রিপোর্টে বলা হয়েছে, গত বছর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই ধরনের ৭১টি ঘটনা সাম্প্রদায়িক উপাদান পাওয়া গিয়েছে। সাম্প্রদায়িক ঘটনার মধ্যে প্রধানত উপাসনালয়, প্রতিমা ভাঙচুর বা অবমাননার ঘটনা ছিল। ৭১টি ঘটনার মধ্যে মন্দির ভাঙচুরের ঘটন ঘটে ৩৮টি, মন্দিরে চুরির ঘটনা একটি, অগ্নিসংযোগের ঘটনা আটটি প্রতিমা ভাঙার হুমকি, ফেসবুক পোস্ট, উপাসনালয় চত্বরে ক্ষতির মতো ২৩টি ঘটনা ঘটেছে।












Discussion about this post