বাংলাদেশে কোটা সংস্কারের দাবিতে ‘বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ২০২৪ সালের জুন-জুলাই মাসে বিশাল বিক্ষোভ-আন্দোলন শুরু করেছিল সে দেশের পড়ুয়ারা। সেই আন্দোলনের অন্যতম মুখ যারা, তাঁদের মধ্যে একজন হলেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। যাকে মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলীতে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। প্রথমে তিনি শ্রম মন্ত্রণালয় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। পরে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয় এবং পরে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ফলে বোঝাই যাচ্ছে উপদেষ্টামণ্ডলীতে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল এই ছাত্রনেতাকে। কিন্তু ইউনূসের সরকার ক্ষমতায় থাকার সময়ই আসিফের বিরুদ্ধে একাধিক আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এ বার বাংলাদেশে সরকার বদল হয়েছে, ইউনূসের বিদায়ের পর এখন বাংলাদেশের ক্ষমতায় বিএনপি সরকার। তাৎপর্যপূর্ণভাবে এবার আসিফের ব্যাঙ্কের হিসাবের তথ্য চেয়ে পাঠাল বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। অর্থাৎ, তারেক রহমানের সরকার এবার বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের নানা আর্থিক দুর্নীতি নিয়ে তদন্ত শুরু করছে।
জানা গিয়েছে, সে দেশের আর্থিক দুর্নীতি তদন্ত সংস্থা বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বাংলাদেশের ৫৬টি তফসিলি ব্যাঙ্ক ও অন্যান্য নন-ব্যাঙ্কিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে আসিফ মাহমুদের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবের সব তথ্য নথিভুক্ত করে বিএফআইইউতে পাঠাতে হবে। যদিও এ বিষয়ে আসিফ মাহমুদের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ছিল, আমি যতদুর জানি, আমি-সহ চারজন উপদেষ্টার ব্যাংক হিসাব তলব করা হয়েছে। পরে এক ফেসবুকে পোস্টে আসিফ মাহমুদ লেখেন, ‘আগামীকাল আমি নিজেই ব্যাংক স্টেটমেন্ট সবার জন্য উন্মুক্ত করবো। পদত্যাগের আগেই আয়-সম্পদের হিসাব মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে দিয়ে এসেছি’। ঘটনাচক্রে গত ১০ ফেব্রুয়ারি উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে অন্তর্বর্তী সরকার। তাতে দেখা যায়, আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার ২০২৫ সালের ৩০ জুনের তথ্য অনুযায়ী মোট সম্পদ ১৫ লাখ ৩৪ হাজার ৭১৭ টাকা এবং তাঁর দায় ২৮ হাজার ৬৬৯ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তাঁর টিআইএন ছিল না বলে উল্লেখ করা হয় সেখানে। বুধবার সন্ধ্যায় অবশ্য আসিফ মাহমুদ দলীয় কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলন করে তাঁর ও পরিবারের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্সের হিসেবনিকেশ পেশ করলেন সর্বসমক্ষে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট যদি কারও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নিয়ে তথ্য তলব করে তাহলে তা অত্যন্ত গুরুতর। কারণ এই সংস্থা অনেকটা ভারতের এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরের মতো। তাঁরা যদি কোনও বিষয়ে তদন্ত শুরু করে তাহলে তা নিয়ে ভাবতেই হয়। এর আগেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দুই উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ও নুরজাহান বেগমের ব্যক্তিগত সচিবের বিরুদ্ধে ব্যপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। তাঁদের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশও দিয়েছিল বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদক। আসিফ মাহমুদের ব্যক্তিগত সচিবের বিরুদ্ধে তো কয়েকশো কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ এসেছিল। কিন্তু মুহাম্মদ ইউনূসের আমলে তা নিয়ে তদন্ত খুব একটা এগোয়নি। তখনই প্রশ্ন উঠেছিল, ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পরও সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টারা তার দায় এড়াতে পারেন কি-না। কিন্তু এবার কে বা কারা আসিফের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করলেন, সেটা নিয়েও একটি বড় দাবি আছে। জানা যাচ্ছে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যালয়ে গিয়ে ‘মব’ সৃষ্টি করে সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করেছিলেন নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য তথা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের একদল ভক্ত। দুদক সূত্র উদ্ধৃতি করে সংবাদমাধ্যমগুলি জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার দুপুরে হঠাৎ করে ২০-৩০ জনের একটি দল সাকিব আল হাসানের পক্ষে স্লোগান দিতে দিতে দুদক কার্যালয়ে জড়ো হয়। এরপর তাঁরা জোরপূর্বক আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগপত্র জমা দিয়ে যায়।












Discussion about this post