সালটা ১৯৭১। বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে দিনটি সোনার হরফে লেখা থাকবে। আর এখন ২০২৬। মাঝে কেটে গিয়েছে ৫৫ বছর। আমেরিকা ও চিন মুক্তিযুদ্ধের ঘোর বিরোধী ছিল। তারা চেয়েছিল অখণ্ড পাকিস্তান যেমন রয়েছে তেমনটাই থাকুক। আমেরিকায় এখন সেই ’৭১-য়ের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তোলপাড়। প্রশ্ন হচ্ছে, এত বছর বাদে আমেরিকার ৫৫ বছর আগের একটি ঘটনা নিয়ে আচমকা সরব হল কেন? না কি এর পিছনে তাদের কোনও গোপন অভিসন্ধি রয়েছে?
কী প্রস্তাব নিয়ে তোলপাড় মার্কিন মুলুক? ১৯৭১-য়ের যুদ্ধে পাক সেনা বাংলাদেশে নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়েছিল। এই মর্মে মার্কিন প্রতিনিধিসভায় একটি প্রস্তাব পেশ হয়েছে। প্রস্তাব পেশ করেছেন গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান। প্রস্তাবটি আমেরিকার বৈদেশিক বিষয়ক কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ’১৯৪৭ সালের অগাস্টে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে। ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল। পাকিস্তানের মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ) অন্তর্ভুক্ত ছিল। যা তখন পূর্ববঙ্গ নামে পরিচিত ছিল। এই ৭১-এর গণহত্যার জন্য পাকিস্তানের হার্মাদ বাহিনীর জন্য পাকিস্তানকে ক্ষমা চাইতে হবে।
পরে এই বিষয়ে টুইট করেন স্টিভ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি লেখেন ‘’১৯৭১ সালের বাংলাদেশের গণহত্যাকে ভুলে গেলে চলবে না। ওহিয়োর ফার্স্ট ডিস্ট্রিক্টে আমার হিন্দু ভোটদাতাদের সাহায্য নিয়ে রো খন্নার সঙ্গে আমি এই প্রস্তাব উত্থাপন করেছি য়ে সেই সময় পাক সেনা কর্তৃক বাঙালি এবং হিন্দুদের বিরুদ্ধে গণহত্যাই সংঘটিত হয়েছিল। ’ টুইট করেছেন রিপাবলিকান রো খন্নাও। ওই সময়কে বিস্তৃত গণহত্যা বলে অভিহীত করে তিনি লিখেছেন, এ ব্যাপারে স্টিভের সঙ্গী হতে পেরে তিনি গর্বিত। এক্স হ্যান্ডেলে তাঁর টুইট Proud to join @RepSteveChabot in introducing the first resolution commemorating the 1971 Bengali Genocide in which millions of ethnic Bengalis and Hindus were killed or displaced in one of the most forgotten genocides of our time.
প্রস্তাব পেশ হওয়ার সময়টাই বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশে মার্চ মাস সংগ্রাম শুরুর মাস। ২৫ মার্চ পাক হানাদার বাহিনী শুরু করে অপারেশন সার্চ লাইট। এই অভিযানে হত্যা করা হয় ৩০ লক্ষ মানুষকে। যদিও কোনও কোনও প্রান্ত থেকে বলা হচ্ছে সংখ্যাটা ৩০ লক্ষের বেশি। মৃতের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু যা নিয়ে কোনও তর্ক হওয়ার অবকাশ নেই যে ২৫ মার্চ পাকিস্তান সেনা একেকজন বাংলাদেশিকে ধরেছে আর কেটেছে। আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা অনুযায়ী, একে গণহত্যা বলা হয়ে থাকে। বলা হচ্ছে, এই হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর ইতিহাসে দ্বিতীয় বৃহত্তম গণহত্যা। নয় মাসে ৩০ লক্ষ মানুষ শহিদ হয়েছেন। দ্রুততম সময়ে নির্বিচারে গণহত্যা।
গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান তাঁর প্রস্তাবের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড ‘নির্বাচিত গণহত্যা’ শিরোনামে ওয়াশিংটনে পাঠানো একটি টেলিগ্রাম। ওই টেলিগ্রামে তিনি লিখেছিলেন, ‘পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মদদে অবাঙালি মুসলিমরা পরিকল্পিতভাবে গরীব মানুষের এলাকায় হামলা চালাচ্ছে এবং বাঙালি ও হিন্দুদের হত্যা করছে।’ তিনি বেশ তথ্যপ্রমাণ নিয়েই প্রস্তাব পেশ করেছেন। শুধু কি গণহত্যা ? মা-বোনদের ধর্ষণ পর্যন্ত করতে দ্বিধা করেনি পাকিস্তানের হার্মাদরা। টার্গেট করা হয়েছিল হিন্দুদের। মার্কিন কংগ্রেস প্রস্তাব গ্রহণ করলে বাংলাদেশের ওপর নতুন করে একটা রাজনৈতিক চাপ তৈরি হবে। বর্তমান সরকার আন্তর্জাতিক নজরদারির মধ্যে পড়ে যাবে। বাংলাদেশের মানুষ কিন্তু এই গণহত্যার তদন্তের দাবি জানিয়ে এসেছে। পাকিস্তানের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক এখন কেমন, তা আর নতুন করে বলার দরকার পড়ে না। বলার দরকার পড়ে না জামায়াতের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের কথাও। এই অবস্থায় কেন এই বিষয় নিয়ে আমেরিকা তোলপাড়।
এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ। পাকিস্তান মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে চুক্তি করেছে। এদিকে আবার তারা ইরানের সঙ্গে একটা অদৃশ্যের সম্পর্কে জড়িয়ে গিয়েছে। এটা আমেরিকার পছন্দ না। তাই, বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তানকে কোণঠাসা করতে ৫৫ বছর আগের একটি ঘটনাকে হাতিয়ার করেছে।












Discussion about this post