বাংলাদেশের ভোটের ফলাফল – বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। জামায়াত একক বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। আপাত দৃষ্টিতে বিষয়টা খুব সহজ মনে হলেও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীতে কিন্তু বিষয়টা সাদা আর কালো নয়। কেন সহজ নয়, তার জন্য আমাদের টাইম মেসিনে চেপে একটু পিছনের দিকে যেতে হবে। নির্বাচনের মুখে মুখে আমেরিকার এক প্রতিনিধিদল জামায়াতের সঙ্গে বৈঠক করেছিল। গত ১ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মহিলা সাংবাদিকদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন ঢাকায় নিযুক্ত এক মার্কিন কূটনীতিক। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেন, আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী আগের চেয়ে ভালো করবে’। ওই কূটনীতিক বলেন, “আমরা চাই তারা আমাদের বন্ধু হোক”। তবে, নিরাপত্তার কারণে ওই কূটনীতিকের নাম প্রকাশ করা হয়নি। তবে বৈঠকের একটি অডিও ফাঁস হয়ে যায়। ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ডিংয়ে শোনা যায়, ঢাকায় নিযুক্ত এক মার্কিন কূটনীতিক আগামী মাসের জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের সম্ভাব্য শক্তিশালী ফলাফলের প্রেক্ষাপটে দলটির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। তিনি বাংলাদেশি সাংবাদিকদের অনুরোধ করেন, জামায়াত নেতৃবৃন্দ ও তাদের শক্তিশালী ছাত্রসংগঠনকে (ছাত্রশিবির) মূলধারার গণমাধ্যমে আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করতে। আমেরিকা নিশ্চিত ছিল জামায়াত ক্ষমতা অর্জন করতে চলেছে। বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পিছনে আওয়ামী লীগের একটা ভূমিকা রয়েছে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। আওয়ামী লীগের ভোটাররা কোনও অবস্থাতেই যে জামায়াতকে ভোট দেবে না, সে ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল রাজনৈতিকমহল। হাসিনার সমর্থকদের একটা বড়ো অংশের ভোট পড়েছে বিএনপির ভোটবাক্সে।
জামাত বাংলাদেশের বৃহত্তম ইসলামপন্থী দল। দেশটির ৫৫ বছরের ইতিহাসে একাধিক বার জামাতকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলেও এই দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছিল। তবে ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে হাসিনা সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাংলাদেশে আবার সক্রিয় হয়েছে জামাত। ইসলামি শরিয়া আইন মেনে সরকার পরিচালনার পক্ষপাতী তারা। এমনকি, সন্তান পরিচালনার কর্তৃব্য পালনের জন্য মহিলাদের কাজের সময় কমিয়ে দেওয়ার পক্ষেও জামাত সওয়াল করেছে বার বার। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে অবশ্য সামাজিক সমস্যা এই দলে প্রাধান্য পাচ্ছে। প্রচার করা হচ্ছে, দুর্নীতি দূর করাই তাদের লক্ষ্য। প্রতিবেদনে এটাও লেখা হয় যে প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, “চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরিস্থিতিতে মার্কিন কূটনীতিকরা ইঙ্গিত দিয়েছেন, তারা ‘পুনরুত্থিত ইসলামপন্থি আন্দোলন’ বা ‘নবোদ্যমে’ ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। গত ১ ডিসেম্বর বাংলাদেশি নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে এক গোপন বৈঠকে ঢাকায় এক মার্কিন কূটনীতিক বলেন, দেশ ‘ইসলামি ধারায় ফিরেছে’। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী তার ইতিহাসের সব থেকে ভালো ফল করতে পারে।
জামায়াত নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি ঠিকই। তবে তারা একক বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তাদের এই ফলাফল বিএনপি সরকারের কাছে উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জামায়াত যে বিএনপিকে এক ইঞ্চি জমি ছেড়ে দেবে না, সংসদে তাদের ভূমিকা দেখে প্রায় নিশ্চিত রাজনৈতিকমহল। সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ নির্বাচনে জামায়াত ৩১ % ভোট পেয়েছে। আর মোট ভোটের হার ৫৯.৪৪ শতাংশ। সহজ পাটিগণিতের হিসেবে জামায়াত অর্ধেকের বেশি ভোট পেয়েছে। এটাই তাদের সরকার-বিরোধী আন্দোলনের অক্সিজেন। এই অবস্থায় বিএনপি সরকারকে রক্ষা করতে পারে আওয়ামী লীগ। প্রশ্ন হল কীভাবে? একমাত্র উপায় আওয়ামী লীগকে জাতীয় রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার পথ প্রশস্ত করা। সামনেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন। হাসিনা দিল্লি থেকে তাঁর দলের নেতাকর্মীদের মাঠে ফেরার নির্দেশ দিয়েছেন। এদিকে আবার তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হওয়ার পর প্রশাসনে বেশ কিছু রদবদল করেন। কিন্তু যে জায়গার বদল কোনওভাবেই তারপক্ষে সম্ভব নয়, সেটা হল অর্থবাজার। অর্থবাজার কিন্তু এখনও আওয়ামী লীগের পক্ষে। যে কোনও দেশের সরকার পরিচালনার রিমোট থাকে অর্থবাজারের হাতে। তারা চাইলে সরকারে বদল আনতে পারে। চাইলে তারা সরকার টিকিয়ে রাখতে পারে। বিএনপি একটি বিষয় বুঝে গিয়েছে যে জামায়াত কোনওভাবেই সরকারকে স্বস্তিতে থাকতে দেবে না। সরকারে প্রতিটি কাজে তারা ব্যাঘাত সৃষ্টি করবে। এই সরকারকে মেয়াদ পূর্ণ করতে হলে আওয়ামী লীগের হাত ধরতেই হবে। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিএনপির কাছে লিটমাস টেস্ট।












Discussion about this post