বিসমিল্লায় গলদ?
সংসদের জামায়াত এবং এনসিপির অবস্থা দেখে সেটাই মনে হচ্ছে। নীচু ক্লাসের ছেলেমেয়েরা যে আচরণ করে, এই দুই দলের সংসদ সদস্য ঠিক সেটাই করেছে। জামায়াত এবং এনসিপি সংসদে কী করেছে, সে বিষয়ে যাওয়ার আগে একবারের জন্য টাইমমেসিনে চেপে যাওয়া যাক ফেলে আসা সেই সব দিনে। নীচু ক্লাসের ছেলেমেয়েরা দাদামণি বা দিদিমণিকে দেখলেই হাত তোলে। চিৎকার করে বলে — স্যর,স্যর স্যর। লাগাতার এই তারস্বরে স্যর কখনও মেজাজ হারিয়ে ফেলেন। কখনও সেই হাত তোলা ছেলে বা মেয়েকে চুপ করে বেঞ্চে বসতে বলেন। সংসদে জামায়াত নেতা শফিকুর রহমান আচমকা নিজের বেঞ্চ ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। জানান, তিনি কিছু বলতে চান। শফিকুর রহমান ভুলে গিয়েছিলেন যে এটা ক্লাসরুম নয়, এটা সংসদ। তাই, সংসদে কিছু বলতে গেলে আগাম নোটিশ দিতে হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, সংসদের কার্যপ্রণালী নিয়ে তাদের কোনও অভিজ্ঞতা না থাকার ফলেই জামায়াত নেতাই এই কাণ্ডটি করেছে। সংসদের অধিবেশন শুরু হওয়ার আগে জামায়াত একটি বৈঠক করে। পৃথকভাবে বৈঠক করেছিল এনসিপিও। মূলত সংসদে দলের রণকৌশল কী হবে, তা নির্ধারণ করতেই এই দুই দলের বৈঠক। বিরোধী শিবিরকে নিয়েও যে বৈঠক হয়েছে, তারও একই উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু বৈঠকের নিট ফল যে ‘হাতে রইল পেন্সিল’ তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। তাছাড়া সংসদে তারা যে আচরণ করেছে, সেই আচরণই বলে দিচ্ছে জামায়াত এবং এনসিপির হাতে পেন্সিল ছাড়া হাতে আর কিছুই রইল না। জামায়াত এবং এনসিপি সংসদে ঠিক কী করেছে, এবার তা নিয়ে দু’চার কথা।
সংসদ অধিবেশনের প্রথমদিনের দৃশ্যপট থেকে একটা অনুমান সকলেই করেছিলেন যে জামায়াত বা এনসিপি একটি দায়িত্বশীল বিরোধীদলের ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হবে। রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু সংসদে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে তারা সংসদকে বিক্ষোভের মঞ্চ করে তোলেন। দুই দল সহ বিরোধী দলের নেতাদের হাতে ছিল প্ল্যাকার্ড। সেখানে সব জ্বালাময়ী স্লোগান। আর জাতীয় সংগীত শুরু হওয়ার সময় মূলত এই দুই বিরোধী দলের সদস্যরা তাদের আসনে বসেছিলেন। জাতীয় সংগীত শুরু হল উঠে দাঁড়ানোটাই যে দস্তুর সেটা তারা ভুলে গিয়েছিলেন। সে কারণে বলা হচ্ছে বিসমিল্লায় গলদ। পডা়শোনা না করে ক্লাসে গেলে ছাত্র বা ছাত্রীরা যে আচরণ করে, জামায়াত এবং এনসিপি ঠিক সেটাই করেছে। তাদের দাবিকে স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমেদ যে কোনও পাত্তা দেবেন না, সেটা বুঝতে পেরে জামায়াত এবং এনসিপি সদস্যরা সংসদ বয়কট করে। বয়কট করলে তাদের হাতে পেন্সিল ছাড়া আর কিছুই থাকবে সেটা তারা বুঝতে পারলে হয়তো সংসদ বয়কট করতেন না।
নির্বাচনের পর জামায়াত তাদের সংসদ সদস্যদের জন্য একটি কর্মশালার আয়োজন করে। উদ্দেশ্য ছিল সংসদে কী ধরনের আচার-আচরণ করতে হবে, তার একটা প্রাথমিক ধারণা তৈরি করা। কিন্তু কর্মশালা করে যে লাভ কিছু হয়নি সংসদে তাদের আচার-আচরণ দেখে সেটা স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বিষয়টা অনেকটা এরকম বলা যেতে পারে। যে জীবনে একদিনের জন্য হারমোনিয়াম বাজায়নি, তাকে কোনও সাংস্কৃতিক মঞ্চে তুলে যদি গান গাইতে বলা হয়, সে কি গান গাইতে পারবে? কিম্বা গালি ক্রিকেটের অভিজ্ঞতা নেই, এমন একজনকে ২২ গজে নামিয়ে দিলে যা হওয়ার সংসদে জামায়াত এবং এনসিপির সেটাই হয়েছে। সালাহউদ্দিন আহমেদ একজন পোড়খাওয়া নেতা। তাঁর উপস্থিতিতে সংসদে কিছু বলার ধৃষ্টতা যে মুর্খামি, সেটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। দৈনিক কার্যাবলীর বাইরে জনগুরুত্বপূর্ণ কিছু বলতে গেলে সংবিধানের ৬২ নম্বর ধারা অনুসারে আগাম নোটিস দিতে হয়। স্পিকার সেই নোটিস দেখে সংশ্লিষ্ট সদস্যকে বলার জন্য সময় বরাদ্দ করেন। সংসদের কাজ চলাকালীন এভাবে হাত তুলে “স্যর আমি কিছু বলতে চাই” যে বলা যায় না সেটা জামায়াত নেতা শফিকুর রহমান কিম্বা এনসিপি নেতা হাসনাতকে কে বোঝাবে। জটায়ু বেঁচে থাকলে নির্ঘাত বলতেন, “আপনাকে তো রীতিমতো কাল্টিভেট করতে হচ্ছে মশাই”।












Discussion about this post