প্রায় এক পক্ষকাল ধরে মধ্যপ্রাচ্যে চলছে ভয়ানক যুদ্ধ। একদিকে ইরানের উপর সামরিক অভিযান চালাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েলের সেনা। অন্যদিকে ইরানও পাল্টা অভিযান চালাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে। যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও বিমানঘাঁটি রয়েছে এমন দেশগুলি, যেমন কাতার, ওমান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, দুবাইয়ের মতো দেশে হামলা চালাচ্ছে ইরান। আবার ইজরায়েল হামলা চালাচ্ছে লেবাননেও। এই পরিস্থিতিতে পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। যার ফলে তেল ও গ্যাসের মতো জ্বালানিবাহী শত শত জাহাজ বা ট্যাঙ্কার আটকে রয়েছে। এর জেরে দক্ষিণ এশিয়ায় ভয়ানক তেল সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশের মতো দেশগুলিতে তেল ও গ্যাসের জোগান কমছে হু হু করে। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় বাংলাদেশে শুরু হয়েছে রেশনিং ব্যবস্থা। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় শিল্প-সহ অন্যান্য খাতে কমানো হচ্ছে গ্যাস সরবরাহ। ফলে আগে থেকেই গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে ভুগতে থাকা বাংলাদেশের শিল্পখাত নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলের ‘কপালে চিন্তার ভাঁজ’ পড়েছে।
ইতিমধ্যেই গ্যাস রেশনিংয়ের অংশ হিসেবে দেশের ৬টি ইউরিয়া সার কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বেশ কয়েকটি অন্যান্য কারখানাও বন্ধ হয়ে গিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের প্রধান রফতানি খাত রেডিমেড পোশাক শিল্পেও।.সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে জ্বালানি চাহিদার ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশই আমদানি করা হয়। আবার জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে এই নির্ভরতা ৯৫ শতাংশের উপরে। অন্যদিকে গ্যাসের চাহিদারও ২৮ থেকে ৩৫ শতাংশ আমদানি করতে হয়। আর এ সবই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের বড় ধাক্কা লেগেছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সার শিল্প। গ্যাসের আকাল শুরু হতেই দেশের ছয়টি বড় ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে পাঁচটিই এখন বন্ধ। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন পরিচালিত ঘোড়াশাল, চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানা, যমুনা ও আশুগঞ্জ কারখানা বন্ধ করা হয়েছে। উৎপাদন বন্ধ রেখেছে বেসরকারি কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানিও। একমাত্র চালু আছে শাহজালাল সার কারখানা। বলা হয়েছে ১৫ দিনের জন্য এই কারখানাগুলি বন্ধ রাখা হচ্ছে, কিন্তু সংশ্লিষ্ট মহল কবে চালু হতে পারে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন।
অন্যদিকে পোশাক শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে বিদ্যুৎ বিভ্রাট বেড়ে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে বাংলাদেশে। বিদ্যুৎ না থাকলে অনেক কারখানা ডিজেলচালিত জেনারেটর চালায়। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে এবার ডিজেল আমদানিতেও ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এই আবহে এখনও কোনও পোশাক কারখানা বন্ধ না হলেও ডিজেলের ঘাটতি ও রেশনিংয়ের কারণে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের মতো বড় শিল্পাঞ্চলে বহু কারখানায় উৎপাদন কমাতে অথবা কিছু শিফট বন্ধ রাখছে বলে সূত্রের খবর। এমন পরিস্থিতিতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্ডার সরবরাহে দেরি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল। এই যুদ্ধ বেশিদিন চললে বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার বাংলাদেশ থেকে সরে অন্য দেশে চলে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি বলছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর বিদ্যুৎ বিভ্রাট দ্বিগুণ হয়ে দিনে প্রায় ৫ ঘণ্টায় পৌঁছেছে। ওই সময় আমাদের ডিজেলচালিত স্ট্যান্ডবাই জেনারেটর চালাতে হয়। কিন্তু এখন পর্যাপ্ত ডিজেলও কিনতে পারছি না। এতে অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে বিদেশি অর্ডার হাতছাড়া হয়ে যাবে।
এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের শিল্প খাতগুলিকে অগ্রাধিকার দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা খুব জরুরি। বিশেষ করে খাদ্যসামগ্রী, ভোজ্যতেল, ওষুধ, সার এবং কৃষি-সম্পর্কিত উৎপাদন অব্যাহত রাখতে বিএনপি সরকারকে দ্রুত কার্যকর নীতি নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদরা। তাঁদের মতে, জ্বালানি সংকটের সময় শিল্পকারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ তৈরি হবে। ঈদের আগে এটা বড় সংকট তৈরি করতে পারে। বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মুহূর্তে দেশের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন ইতিমধ্যে চাপের মুখে রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনাসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহর ও গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিল্প খাতগুলিতে। জানা যাচ্ছে এই পরিস্থিতি এড়াতে রাশিয়া থেকে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি-সহ জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে সরকার। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বৃহস্পতিবার ঢাকায় রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। কিন্তু এর জন্য তাঁদের আমেরিকার অনুমতির প্রয়োজন রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। আর সরকার যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত জটিলতা কাটার অপেক্ষায় রয়েছে বিএনপি সরকার।












Discussion about this post